Advertisement
E-Paper

আর্থিক অনটন, খেলায় নেই ‘শুভেচ্ছা’

এক চিলতে ছোট্ট ঘর। ঘরের এক কোণে আলমারির মাথায় ছোট বড় এক ডজন কাপ। ঘুপচি ঘরের হাঁড়ি, ডেকচিতেও রাখা ছোট, বড়, মাঝারি মাপের কাপ। চৌকির নীচে রাখা লোহার সিন্দুকে নানা মাপের শিল্ড। আর এক কোণে নাইলনের ব্যাগে ঝুলছে ফুটবল। এসব নিয়েই রামপুরহাট পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আস্তানা পাড়ার এই ছোট্ট ঘরে সময় কাটে আটচল্লিশ বছরের জামাতুল ইসলামের। কিন্তু সে সবই তো স্মৃতি!

অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০১৫ ০০:৩৬
জামাতুল ওরফে মানিক।

জামাতুল ওরফে মানিক।

এক চিলতে ছোট্ট ঘর। ঘরের এক কোণে আলমারির মাথায় ছোট বড় এক ডজন কাপ। ঘুপচি ঘরের হাঁড়ি, ডেকচিতেও রাখা ছোট, বড়, মাঝারি মাপের কাপ। চৌকির নীচে রাখা লোহার সিন্দুকে নানা মাপের শিল্ড। আর এক কোণে নাইলনের ব্যাগে ঝুলছে ফুটবল। এসব নিয়েই রামপুরহাট পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আস্তানা পাড়ার এই ছোট্ট ঘরে সময় কাটে আটচল্লিশ বছরের জামাতুল ইসলামের। কিন্তু সে সবই তো স্মৃতি!
ল্যামিনেশন করা ছোট্ট ঘরের দেওয়ালে টাঙানো স্থানীয় রেলওয়ে নেতাজী বয়েজ ক্লাব থেকে পাওয়া দক্ষ সংগঠকের বাঁধানো মানপত্র যেন সেই স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কেন না, ত্রিশ বছর পর এ বার থেকে আর্থিক অনটনে শুভেচ্ছা স্পোর্টিং ক্লাব আর পরিচালনা করতে পারছেন না খেলা-অন্ত প্রাণ জামাতুল। রামপুরহাট শহর ঘুরে ঘুরে এবং রামপুরহাট থানার হরিনাথপুর, ভাটিনা, নলহাটি থানার ছিলিমপুর, সুহারপাড়া, বানিওড়, মথুরাপুর এলাকা থেকে সেরা ফুটবল খেলোয়াড়দের খুঁজে খঁজে ১৯৮৪-২০১৪, একটানা ৩০ বছর রামপুরহাট শহরে শুভেচ্ছা স্পোর্টিং ক্লাব দল পরিচালনা করে এসেছেন জামাতুল।
তিন দশক তো আর কম সময় নয়!
এলাকায় অবশ্য জামাতুল, মানিক নামেই পরিচিত। সকাল ৮টার সময় তাঁকে ঘরে পাওয়া যাবে ভাবতেই অবাক লাগে। রামপুরহাট বড় পোস্ট অফিস লাগোয়া ফুটপাতে জুতো, টুপি বিক্রেতা মানিকের তো এই সময় গাঁধী স্টেডিয়াম মাঠে ফুটবল আর ছেলেদের নিয়ে মেতে থাকার কথা। গতবারও যেমন দেখা গিয়েছে। সেই গত বছরই জেলাতে ক্লাব ভিত্তিক ফুটবল চ্যাম্পিয়ন শিপের খেলা থেকে ছবিটা বদলে যায়। গতবছর রামপুরহাট মহকুমা ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জেলাতে তিন মহকুমার ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের খেলায় অর্থের অভাবে নিজের টিমকে সিউড়িতে খেলতে নিয়ে যেতে পারেননি মানিক। এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টিম নিয়ে যাওয়ার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চরম অপমানিত হতে হয়েছিল মানিককে। বাড়িতে বসে একা গুমরে গুমরে কাঁদতে হয়েছিল তাঁকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবারে পিছিয়ে এসেছেন। মরসুমে দল গড়ে মহকুমা লিগ থেকে জেলা চ্যাম্পিয়ন এবং অন্যান্য খেলায় অংশগ্রহণ করার জন্য বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ পড়ে। সেই টাকা আর কত দিন পরের সাহায্য নিয়ে চালাতে পারব। আর শুভেচ্ছা স্পোর্টিং ক্লাবের জন্য শুধু এই মরসুম কেন আর কোনও দিনই দল গড়ার কাজে নামতে চান না মানিক।

এতে রামপুরহাট মহকুমায় ফুটবল খেলার ইতিহাস কি থেমে গেল?

মানিক বলেন, ‘‘৩০ বছর ধরে একা হাতে দল গড়ে, বাইরে থেকে খেলোয়াড়দের নিয়ে এসে তাদের খেলার সরঞ্জাম দিয়ে এসেছি। এমন কী স্ত্রীর গয়না কখনও বন্ধক, কখনও বিক্রি করে ভাল ভাল ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে খেলার মাঠে লড়াই চালনার জন্য ৩০ বছর ধরে নিরলস ভাবে চেষ্টা চালিয়ে এসেছি। প্রয়োজনে খেলার জন্য একবেলা অভুক্ত থেকে দলকে পরিচালনা করতে হয়েছে। কিন্তু কত দিন আর এ ভাবে চালাতে পারব?’’ তাঁর দল পরিচালনায় রামপুরহাট মহকুমা ফুটবল লিগ ১২ বছর চ্যাম্পিয়ন। এর মধ্যে ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটানা ৮ বছর মহকুমা চ্যম্পিয়ন হয়েছে।

কখনও নিজে খেলে কখনও বা নিজে না খেলে অন্যদের সুযোগ দেওয়ার জন্য মাঠের বাইরে বসে দল পরিচালনা করে মানুষের শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে মানিক তাঁর খেলোয়াড় জীবনে অনেক স্বর্ণালি মুহূর্ত স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, জীবনের পাওনা জেলার বাইরে নদিয়ার গোবিন্দপুরে নেপালের একটি টিমকে ২০১১ সালে সেমিফাইনালে ৩–০ গোলে পরাজিত করা। এছাড়া ৯৩–৯৪ সালে রামপুরহাট গাঁধী স্টেডিয়ামে শিল্ডের নকআউট খেলায় কলকাতার তালতলা একাদশ কে ২ – ১ গোলে হারানোর স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করছে মানিকের। তাঁর স্ত্রী গুমনুব বেগম বলেন, ‘‘দোকানে মাল আনতে হবে বলে আমার কাছ থেকে সোনার গয়না নিয়ে খেলার জন্য সেই পয়সা খরচ সেই খেলার জন্যই মানুষটকে অনেক অপমানিত হতে হয়েছে। তাই যা হয়েছে আর নয়!’’

এসবের পিছনে কি কোনও রাজনীতির হাত রয়েছে? শুভেচ্ছা স্পোর্টং ক্লাবের সম্পাদক ওয়াসিম আলি ভিক্টর সদ্য রামপুরহাট শহর তৃণমূলের যুব সভাপতি হয়েছেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এবারে পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূল সেই ওয়ার্ডে পরাজিত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন তৃণমূলের এই পরাজয়ের ক্ষোভে ভিক্টর শুভেচ্ছা স্পোর্টিং থেকে সরে যাওয়ার জন্য মানিকের অবস্থা আরও খারাপ। ভিক্টর অবশ্য কোনও রাখঢাক না করেই জানান, ‘‘আমি বাইরে সাহায্য করব আর ভিতর ভিতর অন্য দল করবে তাহলে কী করে হবে।’’ মানিকের দাবি, ‘‘আমি কোনও দিন রাজনীতি করিনি। আমার সামর্থ্য নেই তাই আর দল গড়তে চাইছি না।’’

বীরভূম জেলার ফুটবল ময়দানে শুভেচ্ছা স্পোর্টিং ক্লাব থাকবে না, এটা মেনে নিতে পারছেন না শুভেচ্ছার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল রামপুরহাট ফুটবল কোচিং সেন্টার এবং মাড়গ্রামের সোনালি স্পোর্টিং ক্লাব। রামপুরহাট কোচিং সেন্টারের কর্ণধার চাঁদু ভুঁইমালি বলেন, ‘‘রামপুরহাট এবং রামপুরহাটের বাইরে শুভেচ্ছার সঙ্গে খেলা মানে ফুটবলপ্রেমী মানুষের কাছে ছিল মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলের খেলা। তাই চির প্রতিদ্বন্দ্বী একটা টিম থাকবে না সেটা একজন ফুটবলার হিসাবে খারাপ লাগছে।’’

শুনে খারাপ লাগছে, রামপুরহাট মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার কর্মীদেরও। সংস্থার সহ সম্পাদক কমল সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘ছোট থেকে মানিককে খেলার একজন দক্ষ সংগঠক হিসাবে দেখে আসছি। সত্যিই অনেক পরিশ্রম করে। তবে খেলার মাঠ থেকে দল তুলে নেবে সেটা খারাপ লাগছে!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy