Advertisement
E-Paper

ওষুধের নেশা বাড়ছে ঝালদায়, উদ্বেগও

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা— ‘‘কাকে চাই?’’ যুবকের জবাব, ‘‘বাড়িতে কে আছে ডেকে দিন।’’ মহিলা ভাবলেন বাড়ির কর্তার কাছে দরকারি কোনও কাজে এসেছেন আগন্তুক। বাড়ির কর্তা এগিয়ে আসতেই তাঁর দিকে ৫০ টাকার একটা নোট বের করে ওই যুবক চোখের ইশারা করে বলেন, ‘‘একটা ছোট দিন।’’

প্রশান্ত পাল

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০১৫ ০১:৫৭
স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে পুরুলিয়ায় পুলিশের মিছিল। ছবি তুলেছেন সুজিত মাহাতো।

স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে পুরুলিয়ায় পুলিশের মিছিল। ছবি তুলেছেন সুজিত মাহাতো।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা— ‘‘কাকে চাই?’’ যুবকের জবাব, ‘‘বাড়িতে কে আছে ডেকে দিন।’’ মহিলা ভাবলেন বাড়ির কর্তার কাছে দরকারি কোনও কাজে এসেছেন আগন্তুক। বাড়ির কর্তা এগিয়ে আসতেই তাঁর দিকে ৫০ টাকার একটা নোট বের করে ওই যুবক চোখের ইশারা করে বলেন, ‘‘একটা ছোট দিন।’’ গৃহকর্তা তো অবাক। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘ছোট মানে কী?’’ যুবকটি ভেঙে বললেন, ‘‘আরে একটা ছোট ফাইল কোরেক্স দিন।’’ শুনে গৃহকর্তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। তাঁর ছেলেও সব শুনে রেগে লাল। বেঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন বুঝেই আগন্তুক পড়িমড়ি করে দৌড়ে পালান। ওই গৃহকর্তা হলেন ঝালদার পুরপ্রধান মধুসূদন কয়াল।

মাসখানেক আগের এই ঘটনা উল্লেখ করেই বাসিন্দারা বলছেন, ‘‘এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় ঝালদার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, কাশির ওষুধ কোরেক্স খোলা বাজারে আখছার মিলছে ঝালদার যত্রতত্র। কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই কাশির ওষুধ? স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, এক শ্রেণির মানুষ সস্তায় নেশা করার জন্য ব্যবহার করছে এই ধরনের ওষুধ। কমবয়েসিরাও এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ায় আতঙ্কিত অভিভাবকরাও।

ঝালদার প্রাক্তন কাউন্সিলর চিরঞ্জীব চন্দ্র বলেন, ‘‘কিছুদিন ধরে কোরেক্স বা এই ধরনের কাশির ওষুধে বাজার ছেয়ে গিয়েছে। বিশেষত শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ড ও সংলগ্ন এলাকায় বেশি পরিমাণে এই ওষুধ নেশার জন্য বিক্রি হচ্ছে। এলাকায় এক শ্রেণির মানুষের কাছে এই ধরনের ওষুধের চাহিদা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, শহরের কিছু বাড়ি থেকেও বিক্রি করা হচ্ছে।’’ তিনি জানান, লাগোয়া ঝাড়খণ্ড থেকে ঝালদা শহরে এই ওষুধ ঢুকছে। অতিরিক্ত পরিমাণে এই ওষুধ দিনের পর দিন খাওয়ার ফলে কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশকে জানিয়েও বিশেষ কাজ হয়নি।

ঝালদার চিকিৎসক মনোজ মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা, ‘‘বেশ কয়েকমাস ধরে লক্ষ করছি হাত-পা কাঁপুনি নিয়ে কিছু রোগী আসছেন। বুঝতে পারি এ সব নেশার কুফল। কিন্তু তাঁরা কবুল করতে চান না। তবে প্রশাসনের এখনই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা নাহলে বিষয়টি নাগালের বাইরে চলে যাবে।’’ একই কথা বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দাও। ঝালদার এক বাসিন্দার কথায়, কিছুদিন আগে পুরুলিয়া-ঝালদা রাস্তায় দুর্ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তাঁর পকেট থেকেও একটি কোরেক্সের শিশি মিলেছিল। তবে কী কারণে তিনি পকেটে কোরেক্স নিয়ে ঘুরছিলেন তা জানা যায়নি।

ঝালদার মানুষজন বলছেন, ‘‘এই নেশার এমনই তীব্র চাহিদা যে অনেকে পকেটে কোরেক্স ভরে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেচছেন। দিনেরাতে অবাধে শহরের মধ্যে নেশার ওষুধ বিক্রি হলেও কেউ বাধা দেয় না। এই ওষুধ. যাঁরা নিয়মিত নেশার জন্য কেনেন তাঁরা জানেন কোন এলাকায় কাদের কাছে পাওয়া যায়। এই ওষুধের সাঙ্কেতিক ভাষায় দু’ধরনের নাম— ছোট ও বড়।

ঝালদার একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তথা ঝালদার উপপুরপ্রধান মহেন্দ্রকুমার রুংটা বলেন, ‘‘ঝালদার এক শ্রেণির মানুষের কোরেক্সে এমন ডুবে রয়েছে যে এই অবস্থা থেকে ঝালদাকে বের করে আনা এখনই দরকার। নির্বিচারে এই ধরনের ওষুধ ব্যবহারের ফলে এলাকায় কেউ কেউ মৃত্যুরও শিকার হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা এলাকার সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পথে নামব ঠিক করেছি। কারণ এ বার সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। ঠিক করেছি, একটি ফোন নম্বর চালু করব। তাতে নাম-পরিচয় গোপন রেখে যে কেউ এলাকায় কোথায় গোপনে ওই ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে তা জানাতে পারবেন। পুলিশও সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে।’’

কোথা থেকে ঝালদায় ঢুকছে এই ওষুধ? বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ঝালদা আঞ্চলিক কমিটির সম্পাদক প্রদীপ কয়াল বলেন, ‘‘আমরা প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ধরনের ওষুধ বিক্রি করি না। অনেকে দোকানে কোরেক্স রাখা বন্ধও করে দিয়েছেন। আমাদের সংগঠনের সদস্যদেরও বার বার বলছি এই ওষুধ কোনও ভাবেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া তাঁরা যেন বিক্রি না করেন। তবু ঝালদায় কী ভাবে খোলা বাজারে কোরেক্স বিক্রি হচ্ছে বলে জানি না।’’ জেলা ভেষজ নিয়ন্ত্রণ দফতরের আধিকারিক দেবজিৎ সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘ঝালদায় খোলা বাজারে কোরেক্সের মতো ওষুধ বিক্রি হচ্ছে এমন কোনও অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে ওই এলাকার কয়েকটি দোকানে হানা দিয়ে দেখেছি, কোরেক্সের মতো কয়েকটি ওষুধ মজুতের তালিকায় থাকলেও কী ভাবে বিক্রি হচ্ছে তার উল্লেখ নেই। ওই ব্যবসায়ীদের শো-কজ করেছি।’’

ঝালদার পুরপ্রধান মধুসূদন কয়াল বলেন, ‘‘ওই ছেলেটিকে নিয়ে মজা করতে কেউ হয়তো সে দিন আমার বাড়িতে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ওটাই সত্যি, কোরেক্স নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু হয়েছে। সবাইকে নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে আমরা প্রচারে নামব।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy