Advertisement
E-Paper

কোটা বাড়েনি, ভাতা নিয়ে বঞ্চনা চলছেই

বছর আটত্রিশের বুলু বাউরি। কোনও রকমে হাতে-পায়ে চলেন। ৯০ শতাংশ প্রতিবন্ধী। ভিক্ষে করে পেট চালান। তিন বছর আগে বড়জোড়া বিডিও-র কাছে ভাতা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পাননি।

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ অগস্ট ২০১৫ ০১:০১

বছর আটত্রিশের বুলু বাউরি। কোনও রকমে হাতে-পায়ে চলেন। ৯০ শতাংশ প্রতিবন্ধী। ভিক্ষে করে পেট চালান। তিন বছর আগে বড়জোড়া বিডিও-র কাছে ভাতা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পাননি। তাঁর অভিযোগ, বিডিও-র কাছে গেলে ‘কোটা নেই’ শুনে তাঁকে ফিরে আসতে হয়।

বছর বিয়াল্লিশের সনৎ মহন্ত পোলিও আক্রান্ত। ভাল ভাবে হাঁটতে পারেন না। বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্বও তাঁরই। ভায়েরা আলাদা থাকেন। পৈতৃক এক বিঘা জমির ফসলের কিছু অংশ ভায়েরা তাঁকে ভাগ দেন। তা দিয়ে সারা বছর পেট চালাতে হিমশিম অবস্থা তাঁর। তাঁর অভিযোগ, চার বছর আগে সোনামুখীর বিডিও-র কাছে ভাতা চেয়ে আবেদন করেও পাননি। এ ক্ষেত্রেও কারণ সেই ‘কোটা নেই’।

মহাদেব দাসও পোলিও আক্রান্ত। একটি সাইকেল সারাইয়ের দোকান রয়েছে তাঁর। সেই আয়েই স্ত্রী-ছেলের প্রতিপালন করেন। দু’বছর আগে পাত্রসায়র বিডিও-র কাছে ভাতা চেয়ে আবেদন করেছেন। কিন্তু ‘কোটা নেই’ বলে তাঁকে ভাতা দেওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।

Advertisement

বুলুদেবী, সনৎবাবু, মহাদেববাবুরা একা নন। শুধু মাত্র বাঁকুড়া জেলাতেই অন্তত তিন হাজার প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন কয়েক বছর ধরে ২২টি ব্লকে জমে রয়েছে। কিন্তু কারও কপালেই ভাতার টাকা জোটেনি। জুটবে কী করে? বছর বছর প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, কেবলমাত্র বাঁকুড়া জেলাতেই প্রায় ১ লক্ষ প্রতিবন্ধী রয়েছে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। আর এই জেলায় প্রতিবন্ধী ভাতার কোটা রয়েছে মোটে দেড় হাজার (১,৫১৯)। ভাগ্য সদয় হলে কেউ একবার ভাতা পাওয়ার কোটায় জায়গা পেলে আমরণ আর্থিক সাহায্য পান। উপভোক্তার মৃত্যু হলে তখন একটি কোটা ফাঁকা হয়। তখন নতুন নাম ভাতার তালিকায় ঢুকতে পারে।

শেষ কবে রাজ্য সরকার প্রতিবন্ধী ভাতার কোটা বাড়িয়েছে? সমাজ কল্যাণ দফতরে খোঁজ নিয়েও সেই উত্তর মেলেনি। যাঁরা ভাতা পান তাঁরাও দাবি তুলেছেন টাকার পরিমাণ বাড়ানোর। কয়েক সপ্তাহ আগেই রাইপুরে জেলা প্রশাসনের ‘সংযোগ’ অনুষ্ঠানে খোদ জেলা শাসক মৌমিতা গোদারা বসুর কাছে এক প্রতিবন্ধী মহিলা ক্ষোভ উগরে দেন এ বিষয়ে। মাস গেলে ৭৫০ টাকা ভাতায় আখেরে কোনও লাভই হচ্ছে না বলে প্রকাশ্যেই তিনি অভিযোগ করেন। রাজ্য জুড়েই প্রতিবন্ধীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।

গত মার্চেই পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবন্ধী ঐক্যমতের তরফে বিধানসভায় আইন অমান্য আন্দোলন করা হয়েছিল ভাতার কোটা বাড়ানোর দাবিতে। বাঁকুড়া জেলা শারীরিক প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির সভাপতি অজিত বীরের ক্ষোভ, “প্রতিবন্ধীদের জ্বালা সরকার বুঝতে পারে না। যে ব্যক্তি হাঁটতে চলতে পারে না, তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই সরকার তো জঙ্গল মহলের মানুষকে দু’টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে, সারা জেলার প্রতিটি স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে সাইকেল দিচ্ছে, অথচ আমাদের জন্য কেন ভাবছে না?” প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

জনশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার দফতরের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত (অ্যাকাডেমিক রেকগনাইজড) বড়জোড়ার একটি প্রতিবন্ধীদের স্কুল আশার আলো-র সম্পাদিকা সোমা মুখোপাধ্যায় জানান, মাস খানেক আগে ই-মেলের মাধ্যমে সমস্ত সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা সহায়ক ভাতার জন্য আবেদন করতে বলা হয়। তাঁর ক্ষোভ, “ই-মেল পাওয়ার পরে আমি যখন ছাত্রছাত্রীদের আবেদনপত্র জমা দিতে গেলাম প্রশাসন তা নিল না। আমাকে জানিয়ে দেওয়া হল শুধু মাত্র সরকারি স্কুলগুলিই পাবে। তাহলে আমাদের মতো স্কুলের ছেলেমেয়েরা বঞ্চিতই থেকে যাবে?’’ তাঁর সংযোজন, “প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে আধিকারিকদের আরও সচিচ্ছার প্রয়োজন। যা অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।’’

শুধু মাত্র প্রতিবন্ধী ভাতার কোটাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়েনি বার্ধক্য ও বিধবা ভাতার কোটাও। ফলে দিনের পর দিন প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বার্ধক্য ভাতার জন্য বিডিও অফিসে আবেদনপত্র জমা পড়ছে। কিন্তু ভাতা পাচ্ছেন না বেশির ভাগই। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের উপরেও যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে সমাজ কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী শশী পাঁজার কথাতেও। তিনি বলেন, “কোটা বাড়ানোর দরকার। বিষয়টি আমি মুখ্যমন্ত্রীর নজরেও এনেছি। কিন্তু আমাদের রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামো দুর্বল হওয়ায় মেপে পা ফেলতে হচ্ছে। আপাতত বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ৫০ শতাংশ কোটা বাড়ানো হয়েছে। গোটা রাজ্যেই আমরা ধীরে ধীরে কোটা বাড়াব।”

যদিও কোটা বাড়ানো হয়েছে বলে রাজ্য থেকে কোনও নির্দেশিকা জেলায় আসেনি বলেই জেলা সমাজ কল্যাণ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। শশীদেবীর অভিযোগ, “বাম আমলে বহু ভুয়ো উপভোক্তা এই ভাতার সুবিধা পেতেন। আমরা সমস্ত উপভোক্তাকে চিহ্নিত করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাচ্ছি। দফতরকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। তবে সমস্ত সমস্যা মেটাতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।” ভাতার টাকার পরিমাণ বাড়ানোর যে দাবি উঠেছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, “উপভোক্তার সংখ্যা বাড়ানো আমাদের প্রথম লক্ষ্য। তারপর টাকা বাড়াবানোর বিষয়টিতেও আমরা জোর দেব।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy