Advertisement
E-Paper

টুসুতে কুসংস্কার দূর করার ডাক

‘‘কতকাল আর অন্ধ থাকবি ভাই, তোর চেতনাটা না জাগাই/ আত্মা, ঈশ্বর, মন্ত্র বলে পৃথিবীতে কিছু নাই/ অলৌকিকতা আছে শুধু গল্প-নাটক-সিনেমায়/ বাস্তবেতে এদের কিন্ত দেখা মেলে না রে ভাই/ চেতনা বাড়াতে ভাই সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান আরও কিছু পড়াশোনা চাই।’’ মাদল বাজিয়ে নিজের লেখা টুসু গানে কুংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতায় নেমেছেন এক যুবক।

প্রশান্ত পাল

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:৩১

‘‘কতকাল আর অন্ধ থাকবি ভাই, তোর চেতনাটা না জাগাই/ আত্মা, ঈশ্বর, মন্ত্র বলে পৃথিবীতে কিছু নাই/ অলৌকিকতা আছে শুধু গল্প-নাটক-সিনেমায়/ বাস্তবেতে এদের কিন্ত দেখা মেলে না রে ভাই/ চেতনা বাড়াতে ভাই সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান আরও কিছু পড়াশোনা চাই।’’ মাদল বাজিয়ে নিজের লেখা টুসু গানে কুংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতায় নেমেছেন এক যুবক।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক মধুসূদন মাহাতোকে মকর পরবের আগে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এ ভাবেই নিজের লেখা টুসুর গানের মাধ্যমে সচেতন করতে দেখা যাচ্ছিল। শুধু টুসু গান বাঁধাই নয়, সেই সমস্ত গান ছোট্ট বই আকারে ছাপিয়ে রসিকজনের হাতে পৌঁছেও দিচ্ছেন তিনি। পুরুলিয়া শহরের বাসস্ট্যান্ড, হাটের মোড়, কোর্ট মোড়-সহ জেলার ছোটবড় হাটে দেখা মিলেছে মধুসূদন ও তাঁর সংগঠনের সদস্যদের।

বড়টাঁড় হাটে টুসু সঙ্গীত রসিকদের হাতে তাঁর গানের বই তুলে দেওয়ার ফাঁকে গীতিকার মধুসূদন জানালেন, টুসুগান মানভূম তথা পুরুলিয়ার মানুষের প্রাণের গান। এখন প্রায় গোটা জেলা জুড়েই নানা জায়গায় টুসুগান বাজছে। কোথাও মোবাইলে, কোথাও মাইকে, কোথাও মানুষজন গুনগুন করে গাইছেন।

Advertisement

তাঁর কথায়, ‘‘টুসু গানের মাধ্যমে কোনও বক্তব্য বা বার্তা মানুষের মধ্যে পৌঁছনোর একটা শক্তি রয়েছে। এটা প্রামাণিত। তাই চেতনা জাগিয়ে সুস্থ সমাজ গড়ার ডাক দিয়ে ‘মেরা দেশ মহান’, ‘পণপ্রথা’, ‘যোগ’, ‘কুসংস্কার’ এমন সমস্ত বিষয়ে আমি গান লিখেছি।’’

বস্তুত টুসুকে যে কোনও আন্দোলনের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা পুরুলিয়ায় নতুন নয়। টুসু সত্যাগ্রহ ছিল মানভূমের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বড় হাতিয়ার। প্রাক্তন সাংসদ ভজহরি মাহাতোর লেখা টুসুগান— ‘শুনো বিহারী ভাই, তরা রাইখতে লারবি ডাং দেখাঁই...। এই গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিছুদিন আগে টেট পরীক্ষার্থীরাও টুসু ও চৌডল নিয়ে পুরুলিয়া শহরে পদযাত্রা করেছিলেন। তাঁরাও জানিয়েছিলেন, টুসুর মাধ্যমে আন্দোলন অন্য শক্তি পায়।

নিজের লেখা টুসু গানের ছোট্ট বই বিলি করতে করতেই মধুসূদান গেয়ে উঠছেন, ‘‘পণপ্রথাটা হটাতে হলে ভাই, নারীর আত্মমযার্দা জাগা চাই...।’’ কিংবা ‘‘সুস্থ সমাজ গড়তে হলে ভাই, আরও যুক্তিবাদী মানুষ চাই...।’’ এমনই টুকরো টুকরো গান এখন শহরের নানা এলাকায় নানা গলায় শোনা যাচ্ছে। কাড়া লড়াই এই জেলার তো বটেই আশপাশের জেলাতেও বিনোদনের একটা মাধ্যম। কিন্তু এর মধ্যে যে হিংসা রয়েছে, তাও গানে তুলে আনা হয়েছে। গানে বলা হচ্ছে, ‘‘কাড়া লড়াই হিংসার খেলা বন্ধ করতে যাই চল, এই খেলাটা করে সমাজের কী লাভ বল?’’ একটি কাড়া লড়াইয়ের আখড়ায় দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে, ‘‘দেখ কত মানুষ মারা গেল, তবু মানুষগুলার চেতনা নাই জাগিল, মধু বলে মোরগ লড়াই সে খেলাটাও নয় ভাল, দু’টা মোরগ লড়ে নিয়ে কী না কষ্ট পায়।’’

সমাজজীবনের এমন নানা টুকরো ঘটনার ভাল-মন্দ নিয়ে গান বাঁধা হয়েছে। মধুসূদন সরব হয়েছেন, দেশের প্রশাসন ও রাজনৈতিক জগতের দুর্নীতি নিয়েও। মদ-সিগারেট ছাড়ার বার্তাও রয়েছে গানে-গানে।

গানের বই হাতে নিয়ে সিন্দরি গ্রামের অমৃত মাহাতো বা বড়টাঁড় গ্রামের শিখা মাহাতো, সেলানি গ্রামের ভাবনা মাহাতোদের প্রতিক্রিয়া, ‘‘এ রকম টুসুগানের বই খুব একটা দেখা যায় না। তাই কিনলাম। গানের মধ্যে দিয়ে যদি সচেতনতা বা চেতনা তৈরি হয় তাহলে তো সকলেরই ভাল।’’

জেলার লোক গবেষক সুভাষ রায় বলেন, ‘‘টুসুগানের মধ্যে লোকজীবনের কথাই বরাবর থাকে। এই সচেতনার বিষয়টিও লোকজীবনেরই অঙ্গ। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভাল।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy