Advertisement
E-Paper

ধরপাকড়েই রাশ শব্দবাজিতে

মনসা পুজোয় সাউন্ড বক্সের দাপাদাপি আর কালীপুজোয় শব্দবাজি— রাতের ঘুম কেড়ে নেয় বাঁকুড়ার। এ বার যেন তার ছন্দ পতন ঘটল! কালীপুজোর রাতে শব্দবাজির তীব্র আওয়াজে কাঁপল না শহরের অলিগলি। বরং নানা রঙের আতসবাজির ঝিকিমিকি আলোতে রাতের আঁধার দূর হল। শহর ঝলমল করল রঙিন আলোয়। শব্দবাজির দুমদাম শব্দ থেকে বাঁচতে কান চাপাও দিতে হল না! জেলা পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীর কুমারের বক্তব্য, “সাধারণ মানুষের কাছে আমরা শব্দবাজি ব্যবহার না করার আবেদন জানিয়েছিলাম। আমাদের আহ্বানে মানুষ সাড়া দিয়েছেন বলেই এই সাফল্য এসেছে।”

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৫ ০১:০৩
তুবড়ির আলোয় রঙিন হল বিষ্ণুপুর।

তুবড়ির আলোয় রঙিন হল বিষ্ণুপুর।

মনসা পুজোয় সাউন্ড বক্সের দাপাদাপি আর কালীপুজোয় শব্দবাজি— রাতের ঘুম কেড়ে নেয় বাঁকুড়ার।

এ বার যেন তার ছন্দ পতন ঘটল! কালীপুজোর রাতে শব্দবাজির তীব্র আওয়াজে কাঁপল না শহরের অলিগলি। বরং নানা রঙের আতসবাজির ঝিকিমিকি আলোতে রাতের আঁধার দূর হল। শহর ঝলমল করল রঙিন আলোয়। শব্দবাজির দুমদাম শব্দ থেকে বাঁচতে কান চাপাও দিতে হল না! জেলা পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীর কুমারের বক্তব্য, “সাধারণ মানুষের কাছে আমরা শব্দবাজি ব্যবহার না করার আবেদন জানিয়েছিলাম। আমাদের আহ্বানে মানুষ সাড়া দিয়েছেন বলেই এই সাফল্য এসেছে।”

উৎসবে আমোদ করার এই চারিত্রিক পরিবর্তন স্বস্তি এনে দিয়েছে অনেককেই। শহরের বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘আমরা সবাই একসাথে’র সাধারণ সম্পাদক সমীরণ সেনগুপ্ত বলেন, “এ বার মনসা পুজোয় মাইকের দাপট কিছুটা কম ছিল। আবার কালীপুজোতেও শব্দবাজির দাপট সে ভাবে ছিল না। বরাবর এমনটা হলে খুশির খবর বইকি।’’ তবে কালীপুজোর রাতে বিক্ষিপ্ত ভাবে শহরের নতুনচটি, স্কুলডাঙা, সার্কাস ময়দানের মতো কিছু জায়গায় কিছু শব্দবাজি ফেটেছে। তবে তা নেহাতই কম। অনেকে এ জন্য পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করছেন।

Advertisement

বাসিন্দারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত বছরও শহরের যে সব রাস্তায় শব্দবাজির দাপট, বারুদের কটূ গন্ধ, আগুনের ঝলকানি চোখে দেখা যেত, এ বার তেমনটা দেখা যায়নি। বরং তুবড়ি, রং মশাল, ফুলঝুরি নিয়ে ছোটদের সঙ্গে বড়দেরও মেতে উঠতে দেখা গিয়েছে। অরবিন্দনগরের বাসিন্দা সঙ্গীত শিল্পী জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় জানান, রাত যত বাড়ে কালীপুজোর শব্দবাজির তীব্রতা ততই বেড়ে যায়। ঘরে-বাইরে টেকা দায় হয়ে যেত। এ বার মনে হয় বাজারে বাজি কম বিক্রি হওয়ায় ও সব কমেছে। একই সুর শহরের নুনগোলা রোডের বাসিন্দা প্রবীর ঘোষের। তিনি জানান, কালীপুজোর রাতে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে রাস্তায় বের হতেই তিনি ভয় পেতেন।

শব্দবাজির দাপট কম কেন? নানা কারণ উঠে আসছে। যেমন পাঠক পাড়ার যুবক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ সরকাররা জানাচ্ছেন, শব্দবাজি ফাটাতে গিয়ে ইতিপূর্বে পুলিশের হাতে তাঁদের অনেক বন্ধুকে ধরা পড়তে হয়েছে। কিংবা পুলিশ এসে হাত থেকে শব্দবাজি তুলে নিয়ে গিয়েছে। তাই সুখের থেকে স্বস্তি ভাল টের পেয়ে তাঁরা আতসবাজিতেই মজা লুঠছেন।

ব্যবসায়ীরাও এ বার ব্যকফুটে ছিলেন। আগে শহরের লালবাজার, কাটজুড়িডাঙা, সুভাষ রোড প্রভৃতি এলাকায় যাঁরা লুকিয়ে চুরিয়ে নিষিদ্ধ শব্দবাজি বিক্রি করতেন, এ বার তাঁদের ডেরাতে গিয়েও বাজি মেলেনি। কারণ পুজোর আগে থেকেই শব্দবাজি রুখতে সচেষ্ট ছিল পুলিশ। এক বাজি বিক্রেতার কথায়, “গতবার শব্দবাজি রেখে বিপদে পড়েছিলাম। অনেক হুজ্জুতি হয়েছিল। এ বার পুজোর সময় কিছু মুড়ি ফটকা বিক্রি করলেও কালী পুজোয় শব্দবাজির দিকে হাত বাড়াইনি।” খাতড়া শহরের এক বাজি বিক্রেতারও দাবি, গত বছর বেশ কিছু টাকার বাজি মজুত করেছিলেন তিনি। কিন্তু পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বাজি আটক করে নিয়ে গিয়েছিল। কয়েক হাজার টাকা তাঁর লোকসান হয়েছিল। তাই এ বার তিনি ঝুঁকি নেননি।

বাঁকুড়া সদর থানার এক আধিকারিক জানান, পুজোর এক সপ্তাহ আগে থেকে তিনদিন অন্তর বিভিন্ন বাজির দোকানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। পুজো মরসুমে অন্তত ১৫ বস্তা শব্দবাজি আটক করা হয়েছে। এ ছাড়াও সমস্ত পুজো কমিটিগুলিকে শব্দবাজি না ফাটানোর জন্য সতর্ক করা হয়েছে। বহু এলাকায় পুলিশ রাস্তায় নেমেও শব্দবাজির বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করেছে বলে তাঁর দাবি।

এর ফলে আতসবাজি বিক্রি অনেকটাই বেড়েছে। শহরের বড়বাজার এলাকার বাজি ব্যবসায়ী পাপ্পু দত্ত দাবি করেছেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এ বার আতসবাজির বিক্রি অনেকটাই বেড়েছে। মানুষ আর শব্দ বাজি পছন্দ করছেন না। এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, “আইনের মধ্যে থেকে উৎসবে মেতে ওঠার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে বাঁকুড়ায়। আগে বহু পুজো কমিটিই পুলিশের অনুমতি না নিয়ে দুর্গাপুজো, কালীপুজো করত। এ বার পুলিশের অনুমতি নিতে আসা পুজো কমিটির সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।” ওই আধিকারিক জানান, গত বছর ৯৪টি দুর্গাপুজো কমিটি বাঁকুড়া পুলিশের অনুমতি নিয়ে পুজো করেছিল। এ বার ১১২টি পুজো কমিটি ওই পুজোর অনুমতি নিয়েছে। কালীপুজোর ক্ষেত্রেও তাই। গতবার ২৯টি কালীপুজো কমিটি পুজোর অনুমতি নিয়েছিল, এ বার সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২।

বাঁকুড়া শহরের পাশাপাশি বিষ্ণুপুর পুরশহরেও কালীপুজোর রাতে শব্দবাজির দাপট প্রায় ছিলই না বলে জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। তবে বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে শহরের বেশ কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্ত ভাবে শব্দবাজির দাপট দেখা গেলেও তা মাত্রা ছাড়ায়নি বলেই জানাচ্ছেন শহরবাসী। অন্যদিকে দক্ষিণ বাঁকুড়ার মহকুমা শহর খাতড়াতেও শব্দবাজি থেকে স্বস্তি মিলেছে বলেই জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। এই শহরেও কালীপুজোর রাতে বেপরোয়া শব্দবাজির দাপট দেখা যায়।

কিন্তু এ বার ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গিয়েছে। খাতড়ার বলরামপুরের বাসিন্দা কুন্তল গোস্বামী জানান, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তাই শব্দবাজির দাপট কমে গিয়েছে।

ক্লাবগুলিও সচেতন হচ্ছে। শব্দ দুষণের বিরুদ্ধে পুলিশকে গত কয়েক বছরে একাধিক পদক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে। নিয়ম মেনে পুজো করলে পুলিশের তরফে জুটছে পুরস্কারও।

এই সব কারণে বহু পুজো কমিটিরও মানসিকতা বদলেছে বলে মত শহরবাসীর একাংশের। তবে কালীপুজোর প্রথম রাতে শব্দবাজির দাপট রুখতে পারলেও বুধবার দিওয়ালির রাত পুলিশের কাছে চ্যালেঞ্জ।

—নিজস্ব চিত্র।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy