Advertisement
E-Paper

পথ ভুলেছে কাবুলিওয়ালা, ধুঁকছে তসর

যে হাত এক সময় তসরের শাড়ি বুনত, সেই আঙুল এখন বেসনগুলে তেলেভাজা তৈরি করে। যাঁদের পূর্বপুরুষদের শাড়ি মধ্য-প্রাচ্যের দেশে পাড়ি দিত, তাঁরাই এখন পেট চালাতে সব্জি বিক্রি করেন, সংবাদপত্র ফেরি করেন।

শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৫ ০১:২৫
ধীরেশ পাল। তসরের ক্লাস্টার প্রকল্পের পরিচালন সমিতির সভাপতি। তাঁত তুলে দিয়ে এখন তেলেভাজা বিক্রি করেন।

ধীরেশ পাল। তসরের ক্লাস্টার প্রকল্পের পরিচালন সমিতির সভাপতি। তাঁত তুলে দিয়ে এখন তেলেভাজা বিক্রি করেন।

যে হাত এক সময় তসরের শাড়ি বুনত, সেই আঙুল এখন বেসনগুলে তেলেভাজা তৈরি করে। যাঁদের পূর্বপুরুষদের শাড়ি মধ্য-প্রাচ্যের দেশে পাড়ি দিত, তাঁরাই এখন পেট চালাতে সব্জি বিক্রি করেন, সংবাদপত্র ফেরি করেন।

রঘুনাথপুরের তসর শিল্পীদের সোনালি অতীত এখন বয়স্কদের গলাতেই শুধু শোনা যায়। তাঁদের তরুণ প্রজন্ম ওই শিল্প থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। রাজ্য সরকার ক্লাস্টার তৈরি করে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাও বিফল হয়েছে। সেই ক্লাস্টার কমিটির কর্মকর্তারাই অনেকে তাঁত ছেড়ে পেটের ধান্দায় অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন।

শিল্পীদের অভিযোগ, সরকারি সাহায্য না পাওয়া, কাঁচামালের অভাব, সেই সঙ্গে চায়না সিল্কের বাজার দখল ও সর্বোপরি হস্তচালিত তাঁতে শাড়ি-কাপড় বুনে উপযুক্ত দামে ক্রেতা না পাওয়ার মতো একাধিক সমস্যায় জর্জরিত রঘুনাথপুরের তসর শিল্প। কয়েক দশক ধরেই এই শিল্প ধুঁকছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে রাজ্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দফতর শুরু করে ক্লাস্টার প্রকল্প। কিন্তু সেই প্রকল্পের হাত ধরেও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি রঘুনাথপুরের এতিহ্যবাহী এই শিল্প। এই প্রকল্পের পরিচালন সমিতির সভাপতি ধীরেশ পাল বর্তমানে তাঁত ছেড়ে সংসার চালাতে তেলেভাজার দোকান চালাচ্ছেন। সকাল-সন্ধ্যা স্ত্রী অঞ্জনাদেবীর সঙ্গে ঠেলাগাড়িতে স্থানীয় নেতাজি সঙ্ঘের মাঠের সামনে তাঁকে তেলেভাজা বিক্রি করতে দেখা যায়। সময় যত গড়াচ্ছে তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়ার তালিকাটা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে রঘুনাথপুরে।

Advertisement

অবশ্য এমন সম্ভাবনার কথা ঘুণাক্ষরেও বোধহয় ভাবতে পারেননি ৫০ বছর আগে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। তখন রঘুনাথপুরের তসরের আন্তর্জাতিক বাজার ছিল। রঘুনাথপুরের তসর যেত সুদূর আফগানিস্তানের মতো মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোয়। প্রবীণ শিল্পীদের চোখ সে দিনের স্মৃতিতে এখনও চকচক করে ওঠে। তাঁরা শোনাতে শুরু করেন, কাবুলিওয়ালাদের পাগড়ির জন্য তসরের চাহিদা ছিল খুব। বহু কাবুলিওয়ালা এসে অগ্রিম টাকা দিয়ে প্রচুর সংখ্যায় তসরের থানের বরাত দিয়ে যেতেন। তসরের থান বুনে ভালই আয় করতেন তাঁতিরা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কমে গিয়েছে কাবুলিওয়ালাদের যাতায়াত। ধীরেধীরে রুগ্‌ন হয়ে পড়েছে এই ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। তাঁদের আক্ষেপ, ওঁদের সঙ্গে সঙ্গেই তসরের বাজারও হারিয়েছে। তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার তালিকাটা তাই ক্রমশ বাড়ছে।


ফাল্গুনী সাউ। তাঁত টেনে পেট চলে না। তাই সব্জি বিক্রি করে সংসার টানছেন।

রঘুনাথপুরের প্রায় গোটা শহর জুড়েই একদা তাঁত শিল্পের সাথে জড়িয়ে ছিল কমবেশি দু’হাজার পরিবার। বর্তমানে সংখ্যটা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। কিন্তু কেন? ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তসর শিল্পীদের সমবায় সমিতিতে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা পাঁচশোর কিছু বেশি। তাঁদের অনেকেরই কথায়, তাঁত বোনাটা এখন বিকল্প জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেটেও রোজগার না হওয়া, সরকারি সাহায্য না পাওয়া-সহ নানা কারণ তাঁদের কথায় উঠে এসেছে। তাই এই শিল্পে আর তাঁরা থাকতে চাইছেন না।

খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শিল্পী ফাল্গুনী সাউ এখন হাটতলার বাজারে সব্জি বিক্রি করেন। একই পথে নেমেছেন ওই ওয়ার্ডেরই শিল্পী সুধীর দে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রবীর পাল তাঁত ছেড়ে বাসের এজেন্ট হয়েছেন এবং খবরের কাগজ বিক্রির পেশা বেছে নিয়েছেন হৃদয়হরণ দাস প্রমুখ। তাঁতশিল্পী দিলীপ দাস এখন ডিভিসির প্রকল্পে ঠিকা শ্রমিকের কাজ করেন। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দুই বাসিন্দা রাধেশ্যাম দাস, জয়দেব দাস এখন রিকশা চালান। ক্লাস্টার প্রকল্পের পরিচালন সমিতির সভাপতির কেন এই দুরাবস্থা? বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত ধীরেশবাবু মেয়ের বিয়ের জন্য লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁত বুনে সংসার চালিয়ে সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব নয় বলেই বাধ্য হয়ে তেলেভাজার দোকান করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘বাজার নেই। তাঁত বুনে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাই না। তসর শিল্পীদের.সংসার চালাতে অন্য পেশায় যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।’’

তাহলে ঘটা করে ক্লাস্টার প্রকল্প তৈরি করে কী লাভ হল? প্রশ্নটা ঘুরছে তাঁত শিল্পীদের মধ্যেই। বামফ্রন্ট সরকারের শেষের দিকে সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকায় তৈরি হয় ক্লাস্টার ভবন। এ ছাড়া ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসাবে দেওয়া হয়েছিল ১১ লক্ষ টাকা। কাঁচামাল কেনার জন্য মিলেছে তিন লক্ষ টাকা। কিন্তু হাল ফেরেনি তাঁত শিল্পের। বস্তুত বাজারের চাহিদা মতো আধুনিক মানের নকশার শাড়ি, কাপড় বোনার প্রশিক্ষণ না পাওয়া এবং বিপণনের অভাবেই ক্লাস্টার প্রকল্প গড়েও হাল ফেরেনি এই শিল্পের— জানাচ্ছেন শিল্পীরাই।

সমবায়ের সম্পাদক ফাল্গুনী ভায়ার অভিযোগ, ক্লাস্টার প্রকল্প থেকে বিনামূল্যে তাঁরা শিল্পীদের কাঁচামাল (তসর গুটি) সরবরাহ করেন। সেই কাঁচামাল থেকে তসরের থান বোনেন শিল্পীরা। পরিবর্তে শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় সাড়ে ছশো টাকা। এ ক্ষেত্রে কিন্তু শিল্পীদের পুরো পরিবারই জড়িত থাকে থান বোনার কাজে। ফাল্গুনীবাবু বলেন, ‘‘মাসে সর্বোচ্চ ছয়-সাতটি থান বুনতে পারেন শিল্পী বা তাঁদের পরিবার। ফলে মাসিক সাড়ে চার হাজার টাকা রোজগারে কারও পরিবার চলে না। তাই তাঁত বুনতে চাইছেন না বহু শিল্পীই।”


কাজ নেই। ছাদে ঝুলিয়ে রাখা তাঁত।

তবে গোড়াতেই গলদ দেখছেন শিল্পীরা। তাঁদের দাবি, আসলে তসরের থানের সেই চাহিদাই নেই। বরং ক্লাস্টারে ওই থান থেকে শাড়ি তৈরি করে আধুনিকমানের নকশা করতে পারলে ভাল বাজার পাওয়া যেত। এই সহজ সত্যটা সরকার বুঝতে ধরতে পারেনি। তাই ক্লাস্টারের শিল্পীদের সে ভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। মাত্র দু’মাস প্রশিক্ষণ পেয়েছেন কিছু শিল্পী। আর ডোবি, জ্যাকার্ডের মতো আধুনিক তাঁত যন্ত্রের সংখ্যা অপ্রতুল। সমবায় সমিতির ম্যানেজার সমরেশ পালও বলেন, ‘‘তসরের থানের চাহিদা নেই। দোকানে পড়ে থাকে। কিন্তু ক্লাস্টারে সেই থানের শাড়ি বুনে বাজারের চাহিদামতো নকশা করতে পারলে সেই শাড়ি বিক্রি করা যেত।’’ তিনি জানান, এখন তসরের থান থেকে শাড়ি তৈরি করে নকশা বোনার জন্য সমবায় থেকে কাপড় পাঠানো হয় বিষ্ণুপুর, বোলপুর, সোনামুখী, শ্রীরামপুরে।

রঘুনাথপুরে শিল্পীদের আক্ষেপ, বিশ্ববাংলা, মঞ্জুশ্রী, মঞ্জুষার মতো সংস্থার সঙ্গে ক্লাস্টারের সরাসরি যোগাযাগ তৈরি হলে সেখান থেকেও কিছু বরাত মিলতে পারত। কিন্তু বিপণনের সেই প্রক্রিয়াটাই তৈরি হয়নি। একদা তাঁত শিল্পীরা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে আর্থিক সাহায্য পেতেন। গত একদশক ধরে তাও বন্ধ। তাঁত ঘর নির্মাণ, কাঁচামাল-সহ তাঁত সরঞ্জাম কেনার অর্থ পেতেন শিল্পীরা। এখন শুধু মহাত্মা গাঁধী বুনকর যোজনায় মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণটুকু মেলে। এ ছাড়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ভাতা হিসাবে মাসিক একশো টাকা! ধীরেশবাবুর মতো শিল্পীদের আক্ষেপ, বিমা যোজনায় তাঁত শিল্পীর মৃত্যুর পরে ক্ষতিপূপণ পায় পরিবার। কিন্তু আর্থিক অনুদান, সাহায্যের অভাবে প্রতিদিন তিলেতিলে মরছেন শিল্পীরা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy