ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়াল জেলাজুড়ে। কোথাও স্কুলের দেওয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায়, ছুটি হয়ে গেল তো কোথাও ভেস্তে গেল সরকারি বৈঠক। সরকারি দফতরগুলিও ভূমিকম্পের সময় ফাঁকা হয়ে যায়। জেলা প্রশাসন ভবনে কর্মরত অনেক কর্মীরাও ভয়ে পথে নেমে যান।
মঙ্গলবার রামপুরহাটের রক্তকরবী পুরমঞ্চে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলছিল মহকুমার ৮ টি ব্লকের বিডিও এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি-সহ পঞ্চায়েতের প্রধানদের নিয়ে উন্নয়ন মূলক কাজের বৈঠক। ছিলেন জেলা পরিষদের সভাপতি বিকাশ রায় চৌধুরী, জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী, মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জেলা প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকরা। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তকরবী মঞ্চ থেকে তাঁরা বাইরে চলে আসেন।
রক্তকরবীর সামনে রামপুরহাট গার্লস স্কুলের মেয়েরা আতঙ্কে চীৎকার করতে করতে দোতলা থেকে নীচে দ্রুত নেমে আসে। আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে রামপুরহাট জিতেন্দ্রলাল বিদ্যাভবনের ছাত্রছাত্রীরাও স্কুল থেকে ছাড়ে। মুরারই থানার রাজগ্রাম বালিকা বিদ্যালয়ের দোতলার একটি ঘরে আগে থেকে ফাটল ছিল। ভূমিকম্পে বেশি ফাটল হওয়ার জন্য আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পরেন ছাত্রীরা। বাধ্য হয়ে ছুটি দিয়ে দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। রাজগ্রাম এসআরআর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাসিনাতুলা ফেরদৌস বলেন, ‘‘ভূমিকম্পে ফাটল হয়েছে কিনা জানি না, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে সকলে। পরে স্কুলে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।’’
জেলার সদর শহর সিউড়িতে যাঁরা কাজের জন্য বাইরে বা রাস্তায় ছিলেন তাঁদের অনেকেই হয়ত টের পাননি। তবে মঙ্গলবার দুপুরের মৃদু ভূকম্পন যাঁরা অনুভব করেছেন তাঁদের অনেকেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলেন। ভয়ে কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট আসন ছেড়ে ফাঁকা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন বা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। অনেক স্কুলে পড়ুয়াদের সেই সময় বাইরে নিয়ে আসার খবরও রয়েছে। শুধু তাই নয় কম্পনের জেরে দেওয়ালে ফাটল দেখা গিয়েছে জেলাজুড়ে বেশ কয়েকটি স্কুলে। সিউড়ি অজয়পুর উচ্চবিদ্যালয় সেগুলির একটি। ওই স্কুলে ছুটিও দিয়ে দেওয়া হয়।
ফাটল ধরেছে কীর্ণাহার শিবচন্দ্র হাইস্কুলের ছাদে ও পিলারে। বন্ধ হয়ে যায় ক্লাস। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি।
অন্যদিকে পাড়ুই ইউনিয়ন আমজাদ উচ্চবিদ্যালেরও ফাটল দেখা গিয়েছে স্কুলের দোতলায় থাকা পঞ্চম শ্রেণিতে। বিদ্যালয়ের প্রাধান শিক্ষক চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভূমিকম্পের সময় আস্তে আস্তে পঞ্চম শ্রেণির সব পড়ুয়াকেই নামিয়ে আনা হয়েছিল নিচে। পরে সবকিছু সুস্থির হওয়ার পর সবাই যখন ক্লাসে পৌঁছয় দেখা যায় শ্রেণিকক্ষের বাঁ দিকের দেওয়ালে বিশাল ফাটল।’’ দুবরাজপুরের সারদেশ্বরী বিদ্যামন্দির ফর গার্লসের প্রধান শিক্ষিকা সুপ্তী রায় বলেন, ‘‘তখন তিনতলায় ক্লাসে ছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম খুব। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে ছাত্রীরা যাতে আতঙ্কিত না হয় সেটা ভেবেই কয়েক মূহূর্ত অপেক্ষা করছিলাম। তার মধ্যেই থেমে গেল কম্পন।’’
‘‘আচমকা দেওয়াল থেকে ঝুরঝুর করে বালি ঝড়ে পড়তে দেখে ভেবেছিলাম ভেণ্টিলেটারে বাসা বেঁধে থাকা ইঁদুরের কীর্তি বুঝি। কিন্তু মেঝের উপর থাকা পা দুটি ভাইব্রেটারের মতো কেঁপে ওঠতেই টনক নড়ে। মালুম হয় ব্যপারটা কি ঘটছে। পড়িমড়ি করে ক্লাস ছেড়ে বেরোতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে জখম বহু ছাত্র শিক্ষক।’’ বলছিলেন নানুরের কীর্ণাহার শিবচন্দ্র হাইস্কুলের শিক্ষক অরুণ কুমার রায়। ওই স্কুলেই এ দিন একটি দোতলারা বারন্দার বেশ কিছু থামও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রসঙ্গত, এর আগের ভূমিকম্পে ওই স্কুলের ৪ টি ঘরে ফাটল দেখা দেয়। এক সময় ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক নীলকমল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এর আগের ভূমিকম্পের ফাটলগুলি এ দিন আরও বেড়ে গিয়েছে। ক্লাস চলাকালীন যে হারে বার বার ভূমিকম্প হচ্ছে তাতে পড়ুয়াদের নিয়ে স্কুল চালানোটাই আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’’ জানা গেল, পড়ুয়ারা আতঙ্কে দ্রুত ক্লাস ছেড়ে বেরোতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে কেউ কেউ জখমও হয়েছে।
কম্পনে চলকে গেল চা। সাঁইথিয়ায়। ছবি: অনির্বাণ সেন।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পে বোলপুর পুরসভায় কর্মরত কর্মীরা বাইরে ছুটে আসেন। তাঁদের মধ্যে বোলপুরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রেবা দত্তের মাটির বাড়িতে ফাটল ধরেছে। শুধু তাই নয় মহকুমা এলাকার একাধিক বিদ্যালয়ের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। বোলপুর ব্লকের বেড়গ্রাম পল্লি সেবা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের কোথাও দেওয়ালে ফাটল তো কোথাও আবার পিলার সরে গিয়ে গোটা বিল্ডিং-এর একাধিক ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
এ দিন বোলপুরের জামবুনি বাসস্ট্যান্ডের রাস্তায় বিএসএনএল দফতরের আবাসনের পিছনের দিকে একটি দেওয়াল ভেঙে পড়ে। এ দিন বেড়গ্রাম পল্লি সেবানিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মলয় মণ্ডল বলেন, “গতবারের ভূমিকম্পে একাধিক ক্লাসরুমে সামান্য ফাটল দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ দিন দুপুরে ফের ভূমিকম্প হওয়ায় বিদ্যালয়ের দুটি বিল্ডিং-এ মোট সাতটি ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। গোটা বিষয়টি ব্লক প্রশাসনকে জানিয়েছি।’’