Advertisement
E-Paper

ভোজনের পরে হুল্লোড়, মন্দ কাটল না দিন

বাড়িতে ভাইফোঁটার চল থাকলেও এই বিশেষ দিনটাতে আগে এত আনন্দ পায়নি রঘুনাথপুরের অনাথ দুই বোন পলি ও ডলি সাউ। বাড়িতে দিদি ছিল না বলে ফোটা হতো না অনাথ প্রিন্স কুমারের বাড়িতে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০১৫ ০১:২৩

বাড়িতে ভাইফোঁটার চল থাকলেও এই বিশেষ দিনটাতে আগে এত আনন্দ পায়নি রঘুনাথপুরের অনাথ দুই বোন পলি ও ডলি সাউ।

বাড়িতে দিদি ছিল না বলে ফোটা হতো না অনাথ প্রিন্স কুমারের বাড়িতে। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে এদের মতো অনেকেরই ঠাঁই হয়েছে আদ্রার মণিপুর গ্রামের অরুণোদয় শিশু নিকেতন হোমে। জীবন থেকে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া ভাইফোঁটা আবার নতুন ভাবে অনাথ শিশুদের ফিরিয়ে দিলেন হোম কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার ভাইফোঁটার দিনে শুধু নিজেদের ভাইদেরই নয় শতাধিক ভাইকে ফোঁটা দিল জনা পঞ্চাশেক বোন। এক কথায় গণভাইফোঁটা হয়ে গেল। শুধু ফোঁটাই নয়, সকাল থেকে চলল ভালমন্দ খাওয়া দাওয়া। আর দুপুরের পরে এক সঙ্গে গ্রামের মাঠে নেমে প্রাণ খুলে চলল হুল্লোড়, দস্যিপনা।

পুজোর দিনগুলিতে অরুণোদয় শিশু নিকেতনের হোমের প্রায় দেড়শো জন আবাসিক ও পথহারানো ২২টি শিশুকে পুজোর আনন্দ দিতে নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন হোম কর্তৃপক্ষ। অনেক সংস্থা থেকেও নতুন জামাকাপড় দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে হোমটি আর্থিক অনটনে থাকলেও পুজোটা খুব একটা মন্দ কাটেনি এই শিশুদের কাছে। কালী পুজোতে দেওয়ালি ঘর গড়ে মাটির প্রদীপ দিয়ে সেই ঘর সাজিয়ে নিজেদের মতো খুশিতে মেতেছিল তারা।

আর এ বার ভাইফোঁটায় আবাসিকদের মধ্যে ভাইবোনের সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করতে ভাইফোঁটার আয়োজন করেছিলেন হোম কর্তৃপক্ষ। সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই হোমের মেয়েদের হস্টেলে শুরু হয় ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান। হোমের সম্পাদক নবকুমার দাস জানান, সচারচর বোনেদের বাড়িতেই ভাইরা নিতে যায়। অবশ্য উল্টোটা হয় না এমন নয়। কিন্তু তাঁরা স্থির করেছিলেন ছেলেরা এ দিন সবাই মিলে বোনেদের কাছে দলবেঁধে যাবে ফোঁটা নিতে। পুজোয় পাওয়া নতুন জামাকাপড় পরে বোনেদের ‘বাড়িতে’ হাজির হয় শতাধিক ভাই। এ দিকে ভাইদের অপেক্ষায় সকাল সকাল স্নান সেরে থালায় ধান, দুর্বা, চন্দন, দইয়ের উপাচারের ডালা সাজিয়ে তৈরি ছিল বোনেরা। নবকুমারবাবুর কথায়, ‘‘ভাইদের কপালে ফোঁটা দিয়ে একটা অন্যরকম ভাললাগা তৈরি হয়েছিল ছোট মেয়েগুলোর চোখেমুখে। আর দস্যিপনা ছেড়ে শান্ত হয়ে ফোঁটা নিয়েছে ছেলেগুলো।’’

গত কয়েক বছর ধরেই হোমের অনাথ ও কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত পরিবারগুলির ছেলেমেয়েদের কাছে ভাইফোঁটার বিশেষ দিনের খুশি এনে দিতে হোমেই ফোঁটার অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। আর এই দিনটার জন্য তারা যে মুখিয়ে থাকে তা স্পষ্ট সুস্মিতা মিশ্র, সবিতা বাগদিদের কথায়। তারা জানায়, পুজোর পরে স্কুল বন্ধ থাকে বলে বাড়ি চলে গেলেও কালীপুজোর পরেই ফোঁটা দিতে তারা খুশি মনে হোমে ফিরে আসে। আবার একই সাথে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব সম্প্রীতির মোড়কে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ দিন প্রীতি সাউয়ের কাছে ফোঁটা নিয়েছে শঙ্কর আনসারি। শঙ্করের কথায়, ‘‘বাড়িতে থাকার সময় ভাইফোঁটা কী জানতাম না। হোমে এসে দেখলাম দিদি, বোনেরা কি যত্ন করে কপালে ফোঁটা দিয়ে আমাদের মঙ্গল কামনা করছে।”

তবে শুধু মুখে কি ফোটা হয়? নবকুমারবাবু জানান, বরাবরই এই দিনটায় ছেলেমেয়েগুলোর মুখে ভাল খাবার তুলে দেওয়া হয়। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকালে ফোঁটা দিয়েই ভাইবোনেরা একসাথে লুচি, তরকারি আর মিষ্টি খেয়েছে। দুপুরের খাদ্যতালিকায় ছিল ভাত, ডাল, মিক্সড ভেজিটেবল, মুরগির মাংস, চাটনি, মিষ্টি। প্রিন্স কুমার, ভাগ্য সহিসরা জানায়, সারাদিনটাই তাদের কাছে অন্যরকম ছিল। আর সে জন্যই বছরভর তারা এই দিনটার অপেক্ষায় থাকে।

তবে হোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এ বার এই অনুষ্ঠান করা নিয়ে তাঁরা বেশ সংশয়ে ছিলেন। কারণ হোম কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকারের কাছে বিশাল অঙ্কের অনুদান বকেয়া রয়েছে। পুজোর আগে জেলা প্রশাসন অবশ্য চার লক্ষের বেশি কিছু টাকা ঋণ হিসাবে হোম কর্তৃপক্ষকে দিয়েছে। তবে বকেয়ার তুলনায় ওই অর্থ যৎসামান্যই। নবকুমারবাবু জানান, বাজার থেকে কিছু ধার করেই ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান তাঁরা করেছেন। তাতেই তাল কাটেনি এ বারের অনুষ্ঠানে। তাই দিনভর হুল্লোড়ে মাতল ওই ছেলেমেয়েগুলো।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy