গরু পাচার আবার স্ব-মহিমায়। মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান সীমান্ত লাগোয়া বীরভূমের বেশ কয়েক’টি জায়গা থেকে ফের পাচার শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর অভিযোগ। সম্প্রতি মুরারই ২-এর বিডিও-র কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। লিখিত অভিযোগের পেয়ে বিডিও কৃষ্ণকান্ত ঘোষ পুলিশের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। পাচার রুখতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলাশাসক পি মোহন গাঁধীও।
বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা-সীমান্তের অর্থনীতি চার পায়ে হাঁটে, বিধানসভা ভোটের আগে সেই তত্ত্বই বীরভূমে ফের স্বমহিমায়। এলাকাবাসীর মত, সীমান্ত এলাকায় পুলিশ-বিএসএফের যৌথ নজরদারির জেরে কয়েক মাস কিছুটা হলেও গরু পাচারে ভাটা পড়েছিল। তবে পাচার কখনই থেমে থাকেনি বলে অভিযোগ। ইদানীং সেটাই আড়ে-বহড়ে বাড়তে শুরু করেছে বলে মত এলাকাবাসীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বলছেন, ‘‘মুরারই-মিত্রপুর রাস্তার উপর দিয়ে দিনের আলোয় গরু হাঁটিয়ে পার করানো হচ্ছে। পুলিশকে ফোনে সে সব জানানো সত্ত্বেও তৎপরতা নজরে আসেনি।’’
জেলার কোন কোন এলাকা দিয়ে পাচারের বাড়বাড়ন্ত?
স্থানীয় সূত্রে খবর, প্রধানত দু’টি পথ দিয়ে হাঁটিয়ে এবং একটি পথ দিয়ে গাড়িতে গরু বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেমন? মুর্শিদাবাদ সীমান্ত ঘেঁষা মুরারই-মিত্রপুর রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে উমরপুরের কাছে গরুগুলি জড়ো করা হচ্ছে। সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ পার করে সোজা বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। এ ছাড়া, বীরভূমের লোহাপুর হয়ে নলহাটির ভদ্রপুর, তারপরে সেখান থেকে মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের পাঁচগ্রাম হয়েও বাংলাদেশ পাড়ি দিচ্ছে গরু। আর গাড়িতে করে সড়ক পথে ইলামবাজার, দুর্গাপুর-আসানসোল জাতীয় সড়ক ধরে বনগাঁ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে গরু বোঝাই ট্রাক।
আর বীরভূমে গরু ঢুকছে কী ভাবে? পুলিশেরই একটি সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর হাট ইলামবাজারে মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে থেকে গরুগুলি এসে জড়ো হচ্ছে। তারপর নির্দিষ্ট রুটে বাংলাদেশ।
বিরোধী দলগুলি গরু পাচারের জন্যে পুলিশ-প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছে। জেলা সিপিএমের এক নেতার অভিযোগ, ‘‘আগে পুলিশ কিছুটা তৎপরতা দেখিয়েছিল বলেই সামান্য পরিমাণে হলেও পাচারে রাশ টানা গিয়েছিল। কিন্তু, পাচারে শাসক দলের নেতাদের যোগ থাকায় ক্রমশ পুলিশ হাত গুটিয়ে নিয়েছে।’’ সেই সুরেই জেলা বিজেপি-র অন্যতম এক শীর্ষনেতার প্রশ্ন, ‘‘পুলিশ চাইলেই পাচারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু, এই আমলে সেটা হওয়ার আশা কি আছে?’’ এই পরিস্থিতিতে পাচার চলছে এমন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শনি এবং রবিবারও মুরারই-মিত্রপুর রাস্তার দিয়ে সন্ধ্যার দিকে শ’য়ে শ’য়ে গরু হেঁটে চলেছে, সেই ছবি দেখা গিয়েছে। তাতে যানজট বেড়েছে। পথ চলতে ভোগান্তির মুখে পড়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক সময় দিনের বেলা গরুগুলি লোকালয়ের মধ্য দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছে। খেতের ফসল নষ্ট হয়েছে, সেই দৃষ্টান্তও রয়েছে।
তা হলে এলাকাবাসী রুখে দাঁড়াচ্ছেন না কেন? ভুক্তভোগীদের অনেকেই বলছেন, ‘‘আর কিছু না— ভয়। যারা পাচারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বা মদতদাতা তারা নিজেদের স্বার্থ ব্যহত হলে ছেড়ে দেবে নাকি! তখন বাঁচাবে কে?’’
মুরারই থানার হিয়াতনগর মোড়ে শনিবার গরুর হাট বসে। সেই হাটে গরু আনার নাম করে পাচারকারীরা সপ্তাহের প্রতিদিন মুরারই-মিত্রপুর রাস্তা ধরে মুর্শিদাবাদে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। আবার হিয়াতনগর হাট শনিবার শেষ হলেও রবিবার এবং সোমবার অনেক গরুকে হাটে বেঁধে রাখা হয়। পরে সুযোগ মতো পাচার করা হয় গরুগুলি।
এমনটাই কি চলবে? সদুত্তর নেই জেলা প্রশাসনের কাছেও!