Advertisement
E-Paper

মৃত্যু থেকে শিক্ষা, রাশ শব্দে

বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা পার হচ্ছিল। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লোকজনের নাচা-গানার জন্য আয়োজনে কোনও খামতি ছিল না। ভ্যান রিকশায় বাঁধা ঢাউস ঢাউস সাউন্ড বক্স, মাইকের বড় বড় চোঙা। কান ফাটানো শব্দে হিন্দি গানের তালে তালে উদ্দাম নাচ চলছে। ডিজে সাউন্ড বক্স থেকে নির্গত শব্দের গুঁতো ধাক্কা মারছে বুকে, কানে। বিসর্জনকে ঘিরে জেলার নানা প্রান্তে এমন দৃশ্য গা সওয়া হয়ে গিয়েছে অনেকেরই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৫ ০২:০৫
সমারোহ। ঢাক, ঢোল বাজিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা পুরুলিয়া রাঁচি রোড সর্বজনীনের। ছবি: সুজিত মাহাতো

সমারোহ। ঢাক, ঢোল বাজিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা পুরুলিয়া রাঁচি রোড সর্বজনীনের। ছবি: সুজিত মাহাতো

বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা পার হচ্ছিল। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লোকজনের নাচা-গানার জন্য আয়োজনে কোনও খামতি ছিল না। ভ্যান রিকশায় বাঁধা ঢাউস ঢাউস সাউন্ড বক্স, মাইকের বড় বড় চোঙা। কান ফাটানো শব্দে হিন্দি গানের তালে তালে উদ্দাম নাচ চলছে। ডিজে সাউন্ড বক্স থেকে নির্গত শব্দের গুঁতো ধাক্কা মারছে বুকে, কানে। বিসর্জনকে ঘিরে জেলার নানা প্রান্তে এমন দৃশ্য গা সওয়া হয়ে গিয়েছে অনেকেরই। মাস দুয়েক আগে মনসা পুজোর বিসর্জনের সময় বাড়ির সামনে দিয়ে এ রকমই একটি শোভাযাত্রা পার হওয়ার পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন কাশীপুরের বাসিন্দা টিঙ্কু অগ্রবাল নামের এক যুবক। দ্রুত তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কলকাতায়। কিন্তু ওই যুবককে আর বাঁচানো যায়নি! তবে ওই যুবকের মৃত্যুই চোখ খুলে দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এ বার দুর্গাপুজোয় বড় প্রাপ্তি শব্দদৈত্যের নিয়ন্ত্রণ। বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, এ বার রঘুনাথপুর মহকুমা এলাকায় উল্লেখযোগ্য ভাবে সাউন্ড বক্স ও মাইকের দাপাদাপি কম ছিল। অনেকে আবার বিসর্জনে মাইক ও সাউন্ড বক্সের বদলে ঢাক নিয়েই শোভাযাত্রায় বেড়িয়ে ছিলেন। এটা সদর্থক দিক বলেই মনে করছেন বাসিন্দাদের একাংশ।
এ বার পুজোয় যাতে শব্দের দাপাদাপি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগী হয় সে জন্য কাশীপুরেরই বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিক সূর্যনারায়ণ সিংহ দেও জেলাশাসক থেকে মহকুমাশাসক, পুলিশ সুপার থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ-সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। মহালয়ার আগে তিনি চিঠি দেন। আর ভাসানের পরে বোঝা যায়, সেই চিঠিই হোক বা মানুষের শুভবুদ্ধির উন্মেষ, শব্দের দৌরাত্ম্যে এ বার রাশ পড়েছে। সূর্যনারায়ণবাবুর কথায়, ‘‘দেখা যাচ্ছে যে কোনও উৎসব অনুষ্ঠানে মাইকের ব্যবহার এখন দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথায় কথায় যে কোনও অনুষ্ঠানে দিনভর বিকট শব্দে মাইক বাজছে। তাতে অন্য কারও যে অসুবিধা হতে পারে সেদিকে যাঁরা মাইক বাজাচ্ছেন তাঁদের মাথাব্যথা নেই। অল্পদিন আগেই কাশীপুরে বিকট শব্দে একটি বিসর্জনের শোভাযাত্রা পার হওয়ার পরেই এক যুবক অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সে কথা উল্লেখ করেই আমি প্রশাসনের কাছে মাইক বাজানোর নিয়ন্ত্রণের আর্জি জানিয়েছিলাম।’’

স্থানীয়দের কাছেও তিনি এ নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। তাতে কাজও দিয়েছে। মাইক বা বক্সের বিকট শব্দে শোভাযাত্রা সহকারে বিসর্জন বন্ধ করে দিয়েছেন এলাকার কয়েকটি পুজো কমিটি। কাশীপুর উপর বাজার সবর্জনীনের পরিমল দাস বলেন, ‘‘আমরা ঠাকুর বিসর্জন করেছি শুধু ঢাকের বাজনায়। আমাদের জেলার করম, নাটুয়া, কাঠিনাচ, ছৌনাচ-সহ যে সমস্ত লোকনৃত্য রয়েছে সেই শিল্পীদেরই আমরা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় সামিল করেছিলাম। কেন না আমাদের মনে হয়েছে বিকট শব্দে শোভাযাত্রার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই। সাবেকি পদ্ধতির বিসর্জনে বরং অনেক বেশি জৌলুস রয়েছে।’’ কাশীপুরের বড় লোহারপাড়া সবর্জনীনও ঢাক বাজিয়েই বিসর্জন দিয়েছে। ওই পুজো কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা প্রশান্ত ঘোষালের কথায়, ‘‘আমরা বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ঢাক বাজিয়ে বিসর্জন দিই। মাইকের বিকট শব্দ ছাড়া বিসর্জন হয় না এটা আমরা বিশ্বাস করি না।’’

কাশীপুরের দেখানো এই পথে হেঁটেছে জেলারও আরও কয়েকটি পুজো কমিটি। পুরুলিয়া শহরের রাঁচি রোড সবর্জনীন দুর্গাপূজা কমিটিও এ বারে বিসর্জন করেছে কোনও মাইক বা সাউন্ড বক্স ছাড়াই। এই পুজো কমিটির সভাপতি কে পি সিংহ দেও বলেন, ‘‘বিসর্জনের শোভাযাত্রাও পুজোর একটা অঙ্গ। আমরা মনে করি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যেই পুজো করা উচিত। তাতে সকলেই পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। বিকট শব্দে মাইক বা সাউন্ড বক্স ব্যবহার আদালতই বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা কেন বিধি ভাঙতে যাব?’’

Advertisement

কী বলছে জেলা প্রশাসন?

পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার বলেন, ‘‘আমরা পুজো কমিটিগুলিকে শব্দ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছে।’’ জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘প্রশাসন কখনই এ ভাবে বিকট শব্দে মাইক বা সাউন্ড বক্স বাজিয়ে শোভাযাত্রা সমর্থন করে না। এই বিষয়টি পুলিশকে দেখতে বলা হয়েছে। পুজোর আগে বৈঠকের সময় পুজো কমিটিগুলিকেও পুলিশের মাধ্যমে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানোর ব্যাপারে সরকারি নির্দেশিকা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই যে সব পুজো কমিটি সাউন্ড বক্স বা মাইকের তীব্র শব্দ ছাড়াই বিসর্জন করছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। অবশ্যই তাঁরা অন্য পুজো কমিটিগুলিকে এর মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy