গত কালের তল্লাশি অভিযানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপ নিয়ে ইডির কাছে সবিস্তার রিপোর্ট চাইল নরেন্দ্র মোদী সরকার। কিন্তু এ যাত্রায় অতীতের ন্যায় রাজীব কুমার বা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আমলাদের বিরুদ্ধে নয়, মূল অভিযোগের আঙুল উঠেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। তাই ভবিষ্যতে রিপোর্ট কেন্দ্রের ঘরে জমা পড়লেও, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মমতার বিরুদ্ধে কতটা পদক্ষেপ করা সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেই মনে করছেন প্রাক্তন আমলারা।
সূত্রের মতে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ইডির কাছে একটি রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে। প্রাক্তন আমলাদের মতে, এটি অত্যন্ত রুটিন একটি প্রক্রিয়া। সাধারণত কেন্দ্রীয় এজেন্সি কোথাও কাজে বাধা পেলে সে সম্পর্কে রিপোর্ট নথিবদ্ধ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ইডির ওই রিপোর্ট কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে যাওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে রিপোর্টে গত কালের তদন্ত অভিযানের সময়ে ইডিকে কী ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছিল তা সম্পর্কে সবিস্তার জানতে চাওয়া হয়েছে।
সূত্রের মতে, বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচমকা উপস্থিতি এবং তিনি কী কী ভাবে তল্লাশি প্রক্রিয়াকে ‘প্রভাবিত’ করার চেষ্টা করেন, কী ধরনের নথিপত্র নিজের হেজাফতে নেন সে বিষয়ে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি মমতার সঙ্গে কোন পদস্থ পুলিশকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তা জানাতে বলা হয়েছে। ইডি কর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধাসেনা সিআরপি-রও ওই ঘটনায় একটি আলাদা রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, রিপোর্টের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নিতে পারে কেন্দ্র? অতীতে মেট্রো চ্যানেলে হওয়া ধর্নায় কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অবস্থান মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তাই রাজীবের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে রাজ্যকে পদক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল কেন্দ্র। সূত্রের মতে, এ ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তিনি তদন্তে বাধা সৃষ্টি করে তথ্যপ্রমাণ লোপের চেষ্টা করেছেন, এই ধারায় অভিযোগ দায়ের হতে পারে। সম্ভবত সে কারণেই ইডি আজ হাই কোর্টে সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দিয়ে বিষয়টির তদন্তের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় সূত্রের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অমিত শাহের মন্ত্রকের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠবে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। তাই এ ক্ষেত্রে মুখ্যসচিব বা স্বরাষ্ট্রসচিবকে ডেকে নিজেদের অসন্তোষের বিষয়টি জানাতে পারে কেন্দ্র।
ইডির অভিযানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ জানাতে আজ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দেখা করে বিজেপির একটি প্রতিনিধি দল। ধরে নেওয়া যায় এই ঘটনা নিয়ে নিজের রিপোর্ট কেন্দ্রকে জমা দেবেন রাজ্যপাল। এক প্রাক্তন আমলার কথায়, ‘‘সেখানে যদি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্যপাল প্রশ্ন তোলেন, সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রের হাতে ৩৫৫ বা ৩৫৬ ধারা জারি করার মতো অস্ত্র উঠে আসবে।’’ কিন্তু সামনেই পশ্চিমবঙ্গে ভোট। তার আগে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হলে তৃণমূলের জয় যে কার্যত নিশ্চিত হয়ে যাবে, তা বিলক্ষণ জানেন বিজেপি নেতৃত্ব। ফলে সেই পথে হাঁটার সম্ভাবনা কম। রাজনীতিকদের মতে, অতীতে আমলাদের ক্ষেত্রে কড়া পদক্ষেপ করার চেষ্টা করেও, আইনি জটিলতায় বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেনি কেন্দ্র। এ ক্ষেত্রেও মমতার হস্তক্ষেপ যতই অনভিপ্রেত বলে বিজেপি দাবি করুক না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্র কতটা ব্যবস্থা নিতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)