লাও তো বটে, আনে কে! সেই কবে লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র।
কী মোক্ষম সেই কথাশিল্পীর উচ্চারণ, এখন পদে পদে বুঝছে রাজ্যের শিক্ষা শিবির। নিয়মিত স্কুল পরিদর্শন করো। কোন স্কুলের কাজকর্ম কেমন, যাচাই করে নম্বর দাও। জেলার স্কুল পরির্শকদের এই ধরনের হাজারো নির্দেশ দিচ্ছে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দফতর। ‘করো’ তো বটে, কিন্তু করবে কে? লোকই যে নেই! কী ভাবে করা হবে? পরিদর্শনের পরিকাঠামোতেই যে ঘাটতি অনেক!!
স্কুল পরিদর্শনের জন্য রয়েছেন হাতে গোনা কয়েক জন অ্যাকাডেমিক ডিআই। সাব-ইনস্পেক্টর (স্কুল)-এর সংখ্যাও শোচনীয় রকমের কম। তার উপরে গ্রামের দিকে স্কুল পরিদর্শনে গেলে যানবাহনের অসুবিধার জেরে পুরো কাজ করাই হয়ে ওঠে না। ফলে যে-উদ্দেশ্য নিয়ে নিয়মিত স্কুল পরিদর্শনের পরিকল্পনা, সেটাই বিশ বাঁও জলে বলে জানাচ্ছেন স্কুলশিক্ষা দফতরের কর্তাদের একাংশ।
স্কুলশিক্ষা দফতর সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে, রাজ্যের সব স্কুল পরিদর্শন করে রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। অতীতে স্কুলে পৌঁছে পড়ুয়াদের প্রশ্ন করতেন সাব-ইনস্পেক্টর (স্কুল)। সেই প্রশ্নের উত্তরের উপরে স্কুলের কাজকর্মের মূল্যায়ন বা নম্বর নির্ভর করত অনেকটাই। কিন্তু সম্প্রতি খোলনলচে গোটা প্রক্রিয়াটিই বদলে ফেলা হয়। গত তিন বছরে স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফল, ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার কী রকম, তার উপরেই স্কুলের নম্বর নির্ভর করবে বলে জানানো হয়েছে নতুন নির্দেশিকায়। সেই সঙ্গে ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের তালিকা-সহ মোট ৪৪টি বিষয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিব্যাপ্ত পরিদর্শন যথাযথ করতে হলে যে-ন্যূনতম পরিকাঠামো দরকার, তা আছে কি? স্কুলশিক্ষা দফতরের কর্তারাই অকপটে স্বীকার করছেন, ন্যূনতম যে-পরিকাঠামো দরকার, তার অর্ধেকও নেই।
গোটা রাজ্যে রয়েছে ৭৩০টি শিক্ষা সার্কেল। কোনও সার্কেলের আওতায় আছে ৫০টি স্কুল, কোনওটিতে ৯০টি। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সব স্কুলই ওই সমস্ত সার্কেলের অন্তর্গত। সেই সব স্কুল পরিদর্শনের কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্ব মূলত অ্যাকেডেমিক ডিআই-দের উপরেই ন্যস্ত। সেই জন্য সব জেলায় একটি করে অ্যাকেডেমিক ডিআই-পদ রয়েছে। সেই ডিআই-দের অধীনে প্রতিটি সার্কেলের জন্য রয়েছে একটি করে এসআই-পদ। কিন্তু তিনটি জেলা ছাড়া কোনও অ্যাকেডেমিক ডিআই-পদে লোক নেই। ৭৩০টি সার্কেলের প্রতিটিতে এক জন করে এসআই থাকার বদলে রয়েছেন মাত্র ৩৯৮ জন এসআই। রাজ্যে মোট এক হাজার এসআই-পদ থাকলেও তার অর্ধেকের বেশিই শূন্য। লোকাভাবেই মার খাচ্ছে নিয়মিত পরিদর্শন।
স্কুলশিক্ষা দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘প্রশাসনিক কাজ দেখভালের উপরেই জোর দিতে বলা হয়েছিল সাধারণ ডিআই-দের। অ্যাকেডেমিক ডিআই-রা পঠনপাঠন দেখতেন। কিন্তু সরকার তো সেই সব পদে নিয়োগই করেনি। মাঠে নেমে কাজ করেন এসআই-রা। সেখানে অর্ধেক পদ শূন্য। এ ভাবে কাজ চালানো যায় না।’’ অফিস খালি করে স্কুল পরিদর্শন সম্ভব নয় বলে জানাচ্ছেন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘‘পর্যাপ্ত কর্মী না-থাকলে পরিষেবা মিলবে না। আগে পরিকাঠামো ঠিক করা প্রয়োজন।’’