‘সুর’ বাঁধা হয়ে গিয়েছিল সোমবার সকালে বঙ্গভবনের সামনে। সেই ‘লয়’ ধরেই সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন কমিশন অভিযান সম্পন্ন হল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘উদ্ধত আচরণ এবং দুর্ব্যবহারের’ অভিযোগ তুলে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে এলেন তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ভিতরে প্রায় এক ঘণ্টা ছিল মমতার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। কিন্তু কী এমন ঘটল যে বৈঠক বয়কট করলেন মমতা?
জ্ঞানেশ-সহ বাকি কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে মমতা ছাড়াও ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসআইআরে ‘আক্রান্ত’ পরিবারগুলির ১২ জন। তাঁদের পরিবারের কেউ আতঙ্কে মারা গিয়েছেন, জীবিত থাকা সত্ত্বেও কারও নাম মৃত বলে উল্লেখ রয়েছে খসড়া তালিকায়। সূত্রের খবর, মমতা এসআইআরের ‘অপরিকল্পিত’ প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই ‘বাধা’ আসতে শুরু করে কমিশনের তরফ থেকে। মমতা প্রশ্ন তোলেন, প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, এখনও অনেকে হাসপাতালে, তাঁদের দায় কে নেবে? এ হেন নানা প্রশ্নেই জ্ঞানেশ ‘উদ্ধত’ আচরণ করেন বলে দাবি তৃণমূলের।
এর পর দু’তরফের কথা এবং উত্তাপ দুই-ই বাড়তে থাকে বলে খবর। কেন অসমে এসআইআর হচ্ছে না, পশ্চিমবাংলাতেই কেন ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র তালিকা প্রকাশ, কেন মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ— এ হেন একের পর এক প্রশ্ন মমতা করতে থাকেন মমতা। পয়েন্ট ধরে প্রশ্ন করতে থাকেন অভিষেকও। সূত্রের এ-ও খবর, মাঝে মাঝে কল্যাণ আইনি বিষয়গুলি তুলে ধরেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথাও উল্লেখ করেন। শাসকদলের প্রথম সারির নেতৃত্বের বক্তব্য, এই পর্বেই কমিশনের তরফে একাধিক বার বলা হতে থাকে ‘আরে ছোড়িয়ে না (আরে ছাড়ুন না)!’’ কিন্তু তৃণমূল থামেনি, ছাড়েওনি। একের পর এক প্রশ্নবাণ ধেয়ে যায় জ্ঞানেশের দিকে। অকুস্থলে থাকা ‘এসআইআরের ফলে’ মৃতের পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘‘সেই সময়েই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বলেন, আপনাদের (মমতা-অভিষেকদের) কথা শুনব কেন?’’ এর পরেই বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন ক্রুদ্ধ মমতা।
আরও পড়ুন:
-
মুখ্যমন্ত্রীকে ‘অপমান’ প্রসঙ্গে নীরব! মমতা-সাক্ষাতের পর কমিশনের বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি: আইন ভাঙলেই কড়া ব্যবস্থা
-
এসআইআরে ‘ক্ষতিগ্রস্তদের’ পুলিশি হেনস্থা! অভিযোগ শুনেই দিল্লির বঙ্গভবনে অভিষেককে নিয়ে মমতা, বললেন: লড়ে যাব
-
‘আমাদের অপমান করা হয়েছে, এমন কমিশন জীবনে দেখিনি’! ক্ষুব্ধ মমতা সদলবলে বেরিয়ে এলেন বৈঠক ‘বয়কট’ করে
জ্ঞানেশের চেম্বার থেকে বার হওয়ার সময়ে জগদীপ ধনখড়ের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মমতা। সূত্রের খবর, মমতা বলেন— বিজেপির দালালি করলে কমিশনারদেরও দশা হবে ‘ধনখড়জির মতো’। পরে বাইরে বেরিয়ে মমতা বলেন, ‘‘ধনখড়জি যখন আমাদের ওখানে (পশ্চিমবঙ্গে) রাজ্যপাল ছিলেন, রোজ আমাদের বিরুদ্ধে বলতেন, কাজ করতেন। তাঁর কী অবস্থা হয়েছে দেখুন।’’ পশ্চিমবাংলার রাজ্যপাল থাকাকালীনই ধনখড়কে উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে বিজেপি। কিন্তু মেয়াদ শেষের আগেই রহস্যজনক কারণে তাঁকে সরে যেতে হয়। আনুষ্ঠানিক ভাবে অবশ্য ধনখড় শারীরিক কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেন।
যে ১২ জনকে মমতা-অভিষেক ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে দু’জন সংখ্যালঘু পরিবারের প্রতিনিধি। বাকি ১০ জন হিন্দু। সেই হিন্দুদের মধ্যে কারও পদবি ভট্টাচার্য, কারও সর্দার, কারও কর্মকার। এক তৃণমূল নেতার ব্যাখ্যা— মমতা দেখাতে চান, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু-হিন্দু করছে, তারাই দেখুক এসআইআরের ফলে কারা বেশি আক্রান্ত। রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, বিজেপির তরফে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে যে ভাবে এসআইআর প্রক্রিয়ার গোড়া থেকে ‘বাতাস দেওয়া হচ্ছিল’, মমতা সেই ভাষ্যকেই নস্যাৎ করতে চেয়েছেন।
সন্দেহ নেই মঙ্গলবারও রাজধানী শহরে এই রেশ ধরে রাখতে চাইবেন মমতা। তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে সোমবার রাত থেকেই। মমতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কমিশন সংশোধিত পদক্ষেপ না-করলে এর পরে আরও বেশি সংখ্যক লোক নিয়ে দিল্লিতে অভিযান করবেন। তবে বারংবার এ-ও বার্তা দিয়েছেন, কমিশন যা ইচ্ছা করুক, তিনি ময়দানে রাজনৈতিক লড়াই লড়ে নেবেন। মমতার কথায়, ‘‘কমিশনের সঙ্গে বিজেপি আছে। আমাদের সঙ্গে জনগণ আছে। কার শক্তি বেশি দেখে ছাড়ব।’’
ডিসেম্বর মাসের শেষে কলকাতায় সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিষেক দাবি করেছিলেন, সীমা খন্না নামের এক আধিকারিককে দিয়ে কমিশন ‘নাম বাদের খেলায়’ নেমেছে। সূত্রের খবর, বৈঠকেও জ্ঞানেশের উদ্দেশে মমতা প্রশ্ন তোলেন, কে এই সীমা খন্না? কোন সাহসে তিনি এআই ব্যবহার করে নাম মুছছেন? জ্ঞানেশের উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন করেন, মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের কি আপনি বরাত দিয়ে পাঠিয়েছেন? এই প্রশ্নেই জ্ঞানেশ মেজাজ হারান বলে খবর। যদিও কমিশন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূলের সব প্রশ্নের উত্তর তারা দিয়েছে। পাল্টা শাসকদলের দাবি, ক্ষমতা থাকলে বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুক কমিশন।