Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

আমার পড়শি

কোথায় গেল সে সব আশ্চর্য পড়শিরা

সুধীর চক্রবর্তী
০৯ অগস্ট ২০১৫ ০২:৩২

ছোটবেলায় ৬-৭ বছর ছিলাম হাওড়ার শিবপুরে। সেটা যদিও পাড়া, পড়শি জোটার বয়েস নয়। হঠাৎ এক ঝটকায় সব পাল্টে গেল। জাপানি বোমার আতঙ্কে বাবা চলে এলেন বাস্তুগ্রাম নদিয়ার দিগনগরে। এক বছর কাটতে না কাটাতেই মশা আর ম্যালেরিয়ার আক্রমণে সে ডেরাও গোটাতে হল। তা ছাড়া সেখানে বাড়ির ছেলেদের পড়াশোনার জন্য স্কুলও ছিল না।

এ বার বাড়ি কিনে কৃষ্ণনগরে আসা। ধোপাপাড়ায়। রাজার তৈরি সামন্তনগর। বিভিন্ন বৃত্তির মানুষদের নিয়ে গড়ে উঠেছে কলুপাড়া, ছুতোরপাড়া, ধোপাপাড়া, কাঠুরিয়াপাড়া, চাষাপাড়া, পাটনিপাড়া। ১৯৪২-এ দেখলাম গোটা ধোপাপাড়ায় মোটে তিনঘর বাসিন্দা। আমাদের নিয়ে পাড়ায় বামুন বলতে চারঘর। আরও পাঁচমিশেলি নানা জাত। তারাই আমার পড়শি। আমার গড়ে ওঠার বয়সে চোখ, কান, মন তো তারাই খুলে দিয়েছে।

যৌথ পরিবারে বড় হওয়া। জীবনে চিনতে শিখছি কাকে বলে পাড়া, কারাই বা পড়শি। তাকিয়ে দেখি, চারপাশে চাকুরিজীবী দু’পাঁচটা পরিবার, একজন উকিল, ছ’জন মোক্তার। জনাপাঁচেক দোকানদার, কেউ বা কোর্টের সেরেস্তাদার, কেউ কীর্তনীয়া। বাড়িতে রোজ বিকেলে আসে মা-বৌদিদের আলতা পরাবার পিসি, বাটনাবাটুনি মাসি, ঠিকে ঝি, রান্নার বামুনদিদি। এরাই পড়শি। সারা গঞ্জের খবরাখবর এদের পেটে বোঝাই। বাড়ির রুদ্ধ মহিলা মহলে এই মাসি, পিসি, দিদিরাই যেন এক একটা জানালা। তখনই জেনেছিলাম এ সব সাতবাড়ি-চরা গতর খাটানো নারীদের দুটো শ্রেণি— এক বিধবা, আর দুই যাদের ‘ঘরে নেয় না’। আমি ছিলাম ওই দশ-পনেরো জনের সংসারে বাড়ির ছোট ছেলে। তাই সাতখুন মাপ। এই যেমন বাসনমাজার সুন্দরীদিদি। তাকে বললাম একদিন, ‘ও সুন্দরদিদি, একদিন তোমার বাড়ি নিয়ে যাবে?’ শুনে কপাল চাপড়ে বলে, ‘ও আমার কপাল, বাড়ি কোথায় আমার? একখানা এঁদো ঘর। তা যাবা তুমি? সোনা, নিয়ে যাব বৈকী, তবে গিন্নিমার হুকুম হওয়া চাই!’ আমি কী করে জানব যে সুন্দরীদিদির এখনকার চামড়া কোঁচকানো হাড়জিরজিরে শরীরের মধ্যে একখানা বহুভোগ্য অতীত ছিল? বৌদিরা রে রে করে উঠল, ‘খবরদার না।’ তবে মায়ের কোলপোঁছা ছেলে বলে কথা! অনুমতি মিলল। তবে হুকুম, ‘সাবধান, কিচ্ছু খাবে না।’ সুন্দরীদিদি ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে ঘরের তালা খোলে। হরেক জিনিসে থই থই ঘর। একপাশে সরু তক্তাপোশে তেল চিটচিটে ময়লা বিছানা। ঘরে একটা বোঁটকা গন্ধ। তা সবমিলিয়ে এক নতুন জগৎ। দিদি যত্ন করে বটি দিয়ে ফজলি আম কেটে একটা চাকলা হাতে দিয়ে বলে, ‘খাও সোনা, দিদি তোমায় কী পোলাও কালিয়া খাওয়াবে বলো?’ নিষিদ্ধ ফলের উপাদেয় স্বাদ যখন উপভোগ করছি, তখন সুন্দরীদিদি বলল, ‘আমারও বড় ঘর, খাট পালঙ আয়না ছিল গো। ঘরে কত নামকরা মানুষ আসত’, বলেই জিভ কেটে সে কী লজ্জা! তার কথা রেখেছিলাম। গিন্নিমাকে কিচ্ছুটি বলিনি।

Advertisement



পাড়ার একটেরে থাকা সুবাসীপিসি মুড়ি ভেজে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করত। কোনও দিন মা হয়তো একটা মুখবন্ধ করা বড় টিন হাতে দিয়ে বলত, ‘যা, সুবাসীর কাছ থেকে দু’কাঠা গরম মুড়ি নিয়ে আয়।’ তার মানে হাতে স্বর্গ। গেলেই চট পেতে খাতির করে বসাবে পিসি। মুড়ি ভাজতে ভাজতে খানিকটা গরম মুড়ি প্রথমে অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে করে দিয়ে বলবে, ‘খেয়ে নাও মানিক। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। আমার তো ঘরে তোমার মতন মানিক নেই।’ বলেই গুনগুন গানে বলল, ‘মানুষরত্ন সযন্ন করলে না।’ কী তার মানে কে জানে! মুড়ি আনতে গিয়ে একদিন তো আমি অবাক! পিসির ফাঁকা তক্তপোশে নাক ডাকিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে মঙ্গলদাদা। সে তো বাঁকে করে বাড়ি বাড়ি ক্যানেস্তারা টিনের জল দেয়। ছোট ছোট চুল, খালি গা, গাঁট্টাগোট্টা চেহারা আর সর্বদা মুখে পান চিবোনো। জাতে নাকি ওড়িয়া। বাড়ি এসে মাকে ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করি, ‘মা, মঙ্গলদাদা কেন সুবাসীপিসির বিছানায় ঘুমোচ্ছে?’ ‘কেন, তোর জানার দরকার কী?’ বৌদি ধমকায়। মন ছটফট করে।

তার ক’দিন পরে ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। বাড়ির সামনে ছিল ছাতিমতলার মাঠ। সেখানে থাকা ছাতিম গাছটাও আমার পড়শি। ফুল যখন ফুটত চারদিক গন্ধে ম ম। ওই মাঠেই চলত বাতাবি লেবু নিয়ে ফুটবল খেলা আর রবারের বল ও কাঠের ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট। একদিন এমন একটা শট মেরেছি যে বল গড়িয়ে ছাতিমতলা পেরিয়ে চলে গেছে অন্য দিকের ভিটেয়। কাঁচা উঠোন, টিনের ছাদের ঘর আর দাওয়া। বসে আছে রোগা, মাথায় ঝুঁটি ফর্সা এক মাঝবয়সী মহিলা, তার চোখের কী টান! নিমেষে কোলের কাছে টেনে বললে, ‘কাদের বাড়ির গোপাল তুমি? আহা! বল নিয়ে যাও আর মাঝে মাঝে আমার কাছে এসো।’ ঘর থেকে এনে হাতে ধরিয়ে দিল, একদলা মাখা সন্দেশ। পরে ভাবলাম এরাই কি ছেলেধরা? খেলুড়ে সঙ্গীদের এমন আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বলতে তারা বলল, ‘ও তো সর্বেশ্বরী দাসী! বোষ্টম। ভাল কেত্তন গাইত। এখন বয়স নেই, গলাও গিয়েছে।’ তারপর থেকে প্রায়শই দুপুরবেলা ওঁর কাছে শুকসারির দ্বন্দ্ব শুনতাম। বেলা বারোটা নাগাদ তার ভিটেয় এসে বসত শ্রীদাম পাল। চমৎকার ঠাকুর গড়ার হাত। সর্বেশ্বরী করতাল বাজিয়ে গাইত আর শ্রীদাম বাজাত খোল। তারপরে এ ওর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত কতক্ষণ। বছরে একবার অষ্টম প্রহরের হরিসংকীর্তনের আসর বসাত সর্বেশ্বরী। ওই ছাতিমতলার মাঠে। দলের পর দল এসে হরেরাম হরেকৃষ্ণ করে যাচ্ছে আর ঢালাও অন্নমোচ্ছব। আট প্রহর পেরিয়ে খুব ভোরে হত কুলভঙ্গ। শ্রীবাস বোষ্টম এসে গাইত ‘রাই জাগো রাই জাগো’। জলের ধারা নামত সর্বেশ্বরীর দু’চোখে। পাশে বসে শ্রীদাম পাল তার নরম হাত দু’খানি ধরে আছে যে।

কোথায় গেল আমার সে সব আশ্চর্য পড়শিরা? সুন্দরীদিদির ঘর কবেই ধূলিসাৎ। সুবাসীপিসির ঘরখানি গ্রাস করে তার জায়গায় নতুন বাড়ি। সর্বেশ্বরী বোষ্টুমির ভিটের উপর সাজানো ফ্ল্যাট। ছাতিমগাছ, ছাতিমতলার মাঠও নেই। বাবা মাঝেমাঝে বিড়বিড় করতেন, ‘আগে বেশ্যে পরে দাস্যে মধ্যে মধ্যে বোষ্টুমি’— এ কথার মানে কত পরে বুঝলাম। আজ ভাবি, আমার জীবন আর সন্ধান যে বাউলফকির আর বহু রকম বৈষ্ণব-বৈরাগীদের জগতে জড়িয়ে গেল, তার মুখপাত তো পড়শিদেরই চিনে জেনে। অবতলের মানুষজন, যাদের আমি এতটা যে চিনি, আমার সেই সব আরশিনগরের পড়শিরাই, কিশোরবেলা থেকে তাতে ব্যেপে আছে। তারা কেউ হারায়নি।

আরও পড়ুন

Advertisement