Advertisement
E-Paper

পাইলট হতে সুমন যাচ্ছে বোর্ডিংয়ে

এতদিন সে চেয়ে আসছিল, সব কিছু আগের মতো হয়ে যাক। বাবা-মাকে এক ছাদের তলায় এনে দেওয়ার জন্য সে কাকুতি জানাত শিশু কল্যাণ কমিটির ‘কাকুদের’। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিনে বাবা-মায়ের সম্পর্কে টানাপড়েনের শিকার ছোট্ট সুমন (নাম পরিবর্তিত) শিশুকল্যাণ কমিটির বেঞ্চের সামনে জানিয়ে দিল— ‘‘আমি পাইলট হতে চাই। পড়াশোনা করতে চাই।’’

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০১৬ ০১:১৬

এতদিন সে চেয়ে আসছিল, সব কিছু আগের মতো হয়ে যাক। বাবা-মাকে এক ছাদের তলায় এনে দেওয়ার জন্য সে কাকুতি জানাত শিশু কল্যাণ কমিটির ‘কাকুদের’। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিনে বাবা-মায়ের সম্পর্কে টানাপড়েনের শিকার ছোট্ট সুমন (নাম পরিবর্তিত) শিশুকল্যাণ কমিটির বেঞ্চের সামনে জানিয়ে দিল— ‘‘আমি পাইলট হতে চাই। পড়াশোনা করতে চাই।’’

এগারো বছর বয়সের ঠাঁইহারা ছেলের এই আর্জি শুনে শিশু কল্যাণ কমিটির তিন সদস্যের বেঞ্চ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে বাবা বা মায়ের কাছে নয়, পড়াশোনা করতে বোর্ডিং স্কুলেই পাঠানো হবে।

বড়জোড়ার ওই দম্পতির একমাত্র সন্তান সুমন এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। লেখাপড়ায় চৌকস হলেও অভিযোগ বাবা-মায়ের মনোমালিন্যের জেরে তার শৈশব নষ্ট হতে বসেছিল। সমস্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়ি হুগলির হরিপালে চলে যান মা। এই ঘটনায় বড়জোড়ার একরত্তি শিশুটিকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছিল আগেই।

মাঝে তাকে দেওঘরের একটি অনাথ আশ্রমেও পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। সেখানে তাকে দিয়ে বাগান পরিচর্যা থেকে ঘর সাফ করানো সবই করানো হতো। সুমনকে ওই অবস্থায় দেখেন বলে অভিযোগ তুলে তাকে ফিরে পেতে গত ফেব্রুয়ারিতে জেলা চাইল্ড লাইনের দ্বারস্থ হয়েছিল বাবা। ঘটনাটি জেলা শিশু কল্যাণ কমিটির নজরে আসতে সুমনকে বিষ্ণুপুরের সুমঙ্গলম হোমে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

শিশু কল্যাণ কমিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, সুমন কার কাছে থাকতে চায় তা জানতে হোমে একাধিকবার তাকে কাউন্সেলিং করা হয়। সে তাদের কাছে বারবার বাবা-মাকে ফের এক করে দেওয়ার জন্য বলে আসছিল। তার ঠাঁই কোথায় হবে, তা ঠিক করতে শনিবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। সেই মোতাবেক চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার কমিটির সদস্য মহিনুর আলম, রাখহরি নায়েক ও অপূর্ব মণ্ডলের বেঞ্চ বসে। সুমন বেঞ্চের সামনে জানিয়ে দেয়, সে বড় হয়ে পাইলট হতে চায়। তাই ভাল স্কুলে পড়তে চায় সে।

এরপর সুমনের মা জানান, তিনি ছেলেকে ভাল স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করবেন। একই কথা বলেন সুমনের বাবাও। দু’জনেই বেঞ্চের কাছে ছেলেকে নিজেদের কাছে চেয়ে আবেদন করেন। একটি সূত্রে খবর, কী ভাবে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাবেন তা সুনির্দিষ্ট ভাবে বেঞ্চকে জানাতে পারেননি সুমনের মা। সব দিক খতিয়ে দেখে বেঞ্চ সুমনকে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তির নির্দেশ দেয়। তার পড়াশোনার খরচ চালানোর দায়িত্ব তুলে দেয় বাবার হাতেই।

শিশুকল্যাণ কমিটির সদস্য অপূর্ববাবু জানান, নির্দেশে বলা হয়েছে সুমনের মা ও বাবা যে কোনও সময় গিয়ে বোর্ডিং স্কুলে ছেলের সঙ্গে দেখা করে আসতে পারবেন। স্কুল ছুটি থাকলে ছুটির অর্ধেক সে বাবার কাছে ও বাকি অর্ধেক সময় মায়ের কাছে থাকতে পারবে। তিনি বলেন, “বাবা বা মা কোনও এক পক্ষের কাছে থাকলে শিশুটির তার খারাপ প্রভাব পড়ত বলেই আমাদের মনে হয়েছে। তাই দু’জনের থেকে আলাদা ভাবে তাকে বোর্ডিং স্কুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

এ দিকে আজ রবিবার সুমনের ১১তম জন্মদিন। বাড়িতে এই দিনটি খুব ভালভাবেই পালন করা হতো বলে শিশু কল্যান কমিটির কাছে সুমন জানিয়েছিল। সেই অনুযায়ী জেলা চাইল্ড লাইনকে সুমঙ্গলম হোমেই তার জন্মদিনের জন্য একটি অনুষ্ঠান করার নির্দেশ দিয়েছে শিশু কল্যাণ কমিটি। পাশাপাশি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিমাসে সুমনের খোঁজ নিয়ে তার রিপোর্টও শিশু কল্যাণ কমিটির কাছে পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ।

জেলা চাইল্ড ওয়েল ফেয়ার কমিটির কো-অর্ডিনেটর সজল শীল শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, “সুমনের জন্মদিন আমরা হোমের শিশুদের নিয়ে একসঙ্গে করতে চাই। সেই আয়োজনও শুরু করে দিয়েছি। ওই অনুষ্ঠানে তার বাবা ও মাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।” শিশুকল্যান কমিটির নির্দেশ নিয়ে এ দিন কোনও মন্তব্য করতে চাননি সুমনের মা। তিনি বলেন, “আমি কিছু বলতে চাই না।” এতদিন এই বিশেষ দিনে ছেলের পাশে থাকলেও এ বার হোমে ছেলের জন্মদিনে তিনি থাকবেন কি না তা জানাতে চাননি মা। তবে সুমনের বাবা অবশ্য জানিয়েছেন, ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি হোমে আসছেন। তিনি বলেন, “ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম। তা হল না। তবে সে যে একটা ভাল স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পাবে, সেটা ভেবেই কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy