শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। মোবাইল খোয়া গিয়েছে, এমন অভিযোগ নিয়ে বালিগঞ্জ থানায় ঢোকেন মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি। পরনে শার্ট-প্যান্ট, সঙ্গে জ্যাকেট, মাথায় টুপি। চোখে চশমা। থানার ডিউটি অফিসারের কাছে সেই ব্যক্তি জানান, তাঁর মোবাইল খোয়া গিয়েছে। তবে অভিযোগ জানাতে তাঁকে অবশ্য কোনও হেনস্থার সম্মুখীন হতেহল না। পুলিশের তরফে মোবাইল হারানোর রিপোর্ট লিখতে তাঁকে ফর্ম দেওয়া হল। যদিও মোবাইল হারানোর তদন্ত শুরুর আগে থানায় উপস্থিত পুলিশকর্মীরা অন্য এক রহস্য ভেদ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে থানায় একপ্রকার হইচই পড়ে গেল। অত রাতে অভিযোগ জানাতে আসা ব্যক্তিকে চিনতে পেরে এর পরে পুলিশকর্মীরা স্যালুট করতে শুরু করলেন। কারণ, তিনি আর কেউ নন, কলকাতার সদ্যনিযুক্ত নগরপাল সুপ্রতিম সরকার।
ওই রাতে বালিগঞ্জ থানায় এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়েছেন অনেকে। নগরপালকে চিনতে পেরেআচমকা ব্যস্ততা বেড়ে যায় ওই থানায়। পরে থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন নগরপাল। লালবাজার জানিয়েছে, ওই রাতে বালিগঞ্জ থানার পরে সার্ভে পার্ক থানাতেও এক প্রকার ছদ্মবেশে পৌঁছেছিলেন নগরপাল। সেখানে অবশ্য তাঁকে কেউ চিনতে পারেননি। ফলে মোবাইলহারানোর কথা জানানোয় তাঁরহাতে অভিযোগ জানানোর ফর্ম তুলে দেওয়া হয়। পরে নগরপাল সেখানে নিজের পরিচয় দেন।লালবাজার সূত্রের খবর, সার্ভে পার্ক থানায় যখন নগরপাল গিয়েছিলেন, তখন রাত ১২টা বেজে গিয়েছে। সে সময়ে থানার ওসি সেখানে না থাকলেও নগরপাল তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে টোটোয় চেপে এ ভাবেই শহর দেখতে বেরিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের এক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। তারও আগে ২০২১ সালে পুণের পুলিশ কমিশনারের এ ভাবে ছদ্মবেশে শহরে ঘুরে বেড়ানোর খবর সামনে এসেছিল।
লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, শহরে অনেক থানায় গিয়ে অভিযোগকারীরা পুলিশের সাহায্যের বদলে পুলিশি টালবাহানা ও হেনস্থার শিকার হন— এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তাই ওই রাতে তিনি নিজেই সাধারণ পোশাকে, কোনও নিরাপত্তাকর্মী ছাড়াই শহরের দু’প্রান্তের দুই থানায় যান। পরিচয় গোপন রাখতে নগরপাল টুপি পরেছিলেন, সরকারি গাড়ি নেননি। নিজের গাড়িটিও থানা থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়করিয়ে রাখেন। তবে দুই থানাতেই অভিযোগ জানাতে গিয়ে তাঁকেকোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে না হওয়ায় ওই দুই থানার পুলিশের কাজকর্ম নিয়ে নগরপাল সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পরে দুই থানার ওসিদের সঙ্গে তিনি কথাও বলেন। তবে মাঝেমধ্যেই তিনি এমন ছদ্মবেশে ‘হানা’ দেবেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন।
রবিবার নগরপাল বলেন, ‘‘রাতে পুলিশকর্মীরা সতর্ক আছেন কিনা, এবং কেউ অভিযোগ জানাতে এসে হেনস্থার মুখে পড়ছেন কিনা, তা দেখতেই থানায় গিয়েছিলাম।’’ তবে দুই থানার অফিসারেরা যথেষ্ট তৎপরতা দেখিয়েছেন বলে তিনি জানান।
এক পুলিশকর্তা জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পরেই নগরপাল শহরে যান চলাচলের উন্নতিতে সব চেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। সে জন্যট্র্যাফিক আধিকারিকদের ‘হোম টাস্ক’ বেঁধে দিয়েছেন তিনি। ওই কর্তার দাবি, নগরপালের এমন ভূমিকায় শহরের যান চলাচল অনেকটাউন্নত হয়েছে। ট্র্যাফিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে কোথায় কোথায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কী সমস্যা রয়েছে, তার সমাধাননিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছেন নগরপাল। কলকাতা পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগ তা জমা দিয়েছে বলে খবর। এর পরেই তিনি থানার উপরে নজরদারি শুরু করতে রাতের শহর ঘোরার পরিকল্পনা করেছেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)