বিচারকেরা নথিযাচাই এবং নিষ্পত্তির কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু বিচারকদের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের কাছ থেকে এই রিপোর্টই গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। তার পরেই পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়ে মঙ্গলবার জরুরি শুনানিতে বসল দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিল, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ভিন্রাজ্য থেকেও বিচারক নেওয়া যাবে।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে জরুরি ভিত্তিতে শুনানি হয় রাজ্যের এসআইআর মামলার। এজলাস বসার পরে প্রথমেই শোনা হয় মামলাটি। সেখানে উঠে আসে হাই কোর্ট থেকে পাঠানো রিপোর্টের প্রসঙ্গও। প্রধান বিচারপতি কান্ত জানান, হাই কোর্ট থেকে বলা হয়েছে যে এই কাজের জন্য পর্যাপ্ত লোকের অভাব রয়েছে। প্রতিদিন ২৫০টি করে নিষ্পত্তি করলেও, প্রায় ৮০ দিন সময় লাগবে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট চাইছে সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হোক। তাই আদালত জানিয়ে দিয়েছে, এই কাজে ভিন্রাজ্য থেকেও বিচারক নেওয়া যাবে। দুই প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড থেকে বিচারকদের পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এর কাজে আনা যাবে বলে জানান প্রধান বিচারপতি কান্ত। পাশাপাশি তিন বছর বা তার বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিভিল জজ (সিনিয়র এবং জুনিয়র ডিভিশন) পদমর্যাদার অফিসারদেরও নেওয়া যাবে। কাজে নেওয়া যাবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদেরও।
ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিদেরও সুপ্রিম কোর্ট অনুরোধ করে, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কোনও আবেদন এলে তা সহানুভূতির সঙ্গে ও জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্রাজ্য থেকে আসা বিচারকদের পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে রাজ্য। সরকার পক্ষের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই সওয়ালই করেন। তিনি বলেন, “অন্য রাজ্য থেকে বিচারক এলে তাঁরা বাংলা বুঝতে পারবেন না।”
তবে এই সমস্যা সমাধানের কোনও উপায় আপাতত নেই বলেই জানাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি কান্তের মন্তব্য, “এই অবস্থায় আমাদের কিছু করার নেই। ইতিহাস বলছে, এক সময় ওই রাজ্যগুলি একই প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। তাই স্থানীয় উপভাষা বা ভাষার ধরন থেকে কিছুটা বুঝতে পারবেন।”
রাজ্যে এসআইআর-এর কাজে যে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের অভাব রয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্টে উঠে আসা পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। প্রধান বিচারপতি জানান, পশ্চিমবঙ্গে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি (তথ্যগত অসঙ্গতি) এবং আনম্যাপড তালিকায় রয়েছে প্রায় ৮০ লক্ষ নাম। এর মধ্যে জেলা বিচারক ও অতিরিক্ত জেলা বিচারক পদমর্যাদার প্রায় ২৫০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে প্রায় ৫০ লক্ষ দাবি যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এই কাজে যে আরও লোকবল প্রয়োজন, তা সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। তবে কাদের এই কাজে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার কলকাতা হাই কোর্টের উপরেই ছেড়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার কথা কমিশনের। বাকি মাত্র কয়েকটা দিন। সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে শনিবারের বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। ইতিমধ্যেই আগামী ৯ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের সমস্ত বিচারকের ছুটিও বাতিল করেছে হাই কোর্ট। কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় কমিশনও। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের আইনজীবী জানান, অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের কোনও সময়সীমা নেই। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরেও এই তালিকা প্রকাশ করা যেতে পারে। ফলে অতিরিক্ত সময় হাতে থাকছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, পরে যে তালিকাগুলি প্রকাশিত হবে, সেগুলিকেও ২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকা হিসাবেই ধরা হবে। একই সঙ্গে আদালত এ-ও জানিয়েছে, যাচাই প্রক্রিয়া হবে নির্বাচন কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ীই। ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে জমা নথিই যে গ্রহণ করা হবে, তা-ও স্পষ্ট করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
আরও পড়ুন:
এ বিষয়ে পরে রাজ্য সরকারের আইনজীবী কল্যাণ আদালত চত্বরে বলেন, “আজ সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসাবে এই মামলাটি শোনে। আমরা কাল রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ জানতে পারি। প্রধান বিচারপতি জানান, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি তাঁকে একটি স্টেটাস রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন ২৫০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আরও প্রয়োজন। সেই কারণে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, সিনিয়র এবং জুনিয়র ডিভিশনের সকল বিচারককে নেওয়া যেতে পারে। কাদের নিয়োগ করা হবে তা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ঠিক করবেন। এ ছাড়া আগের নির্দেশই বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদেরও নেওয়া যেতে পারে। এর পরেও পর্যাপ্ত না হলে ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের চেয়ে রিকুইজ়িশন করতে পারেন প্রধান বিচারপতি।”
কল্যাণ আরও বলেন, “বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে কাজ করছেন। অন্য কেউ কোনও নির্দেশ দিতে পারবেন না। ২৮ তারিখ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার পরে বেশ কিছু অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কোনও নির্দেশ দেওয়া যাবে না। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে কাজ করেন। তাঁদের কোনও নির্দেশ দেওয়া যাবে না।”
সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শেষ হওয়ার পরে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলও এই নির্দেশকে নিজেদের ‘জয়’ বলেই ব্যাখ্যা করছে। সমাজমাধ্যমে তৃণমূল লিখেছে, “বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে চক্রান্ত ‘নির্যাতন কমিশন’ শুরু করেছিল, সুপ্রিম কোর্ট তা ব্যর্থ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, সার্টিফিকেট এবং আধার কার্ডকে পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ -এর মধ্যে জমা পড়া এই সমস্ত নথিপত্র বৈধ হিসাবে বিবেচিত হবে। এই নির্দেশই বুঝিয়ে দিল, অন্যায় ভাবে ও অগণতান্ত্রিক চক্রান্ত করে বাংলার মানুষের কণ্ঠরোধ করা যাবে না।”