সরকারি স্কুলের প্রার্থনায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। কিন্তু শিক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন, স্কুলে প্রার্থনার জন্য যেটুকু সময়বরাদ্দ, তাতে বন্দে মাতরমের সব ক’টি স্তবক গাওয়া কি সম্ভব? প্রার্থনার সময়ে বন্দে মাতরমের পাশাপাশি জাতীয় সঙ্গীত এবং স্কুলের নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীতও গাওয়া হয়। এমনকি, তৃণমূল সরকার তাদেরআমলে রাজ্য সঙ্গীত হিসাবে ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গাওয়াও বাধ্যতামূলক করেছিল। সেই গান গাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে, এমন কোনও নির্দেশিকা এখনও আসেনি। স্কুলে প্রার্থনার সময় ১০ মিনিট। ওই সময়ের মধ্যে এতগুলি গান গাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। শিক্ষকদের একাংশের তাই দাবি, প্রার্থনা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু ভাবে শেষ করতে বন্দে মাতরমের প্রথমদু’টি স্তবক গাওয়ার নির্দেশিকা জারি করা হোক।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অধীনস্থ সমস্ত স্কুলে প্রার্থনা শুরু হয় সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে। ১০ মিনিটেরপ্রার্থনার পরে ১০টা ৫০ মিনিট থেকে শুরু হয় ক্লাস। শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, বেশির ভাগ স্কুলেই প্রার্থনা হয় স্কুলের নিজস্ব মাঠে বা স্কুল চত্বরে। স্থানাভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসঘরেও প্রার্থনা হয়। মাঠে প্রার্থনার ক্ষেত্রে সমস্ত শিক্ষক ও পড়ুয়ার সেখানে জড়ো হওয়া এবং প্রার্থনা শেষে সকলের ক্লাসে ফেরার প্রক্রিয়ায় মিনিট পাঁচেক লেগেই যায়। তাই প্রকৃতপক্ষে প্রার্থনাসঙ্গীত গাওয়ার জন্য সময় বরাদ্দ থাকে পাঁচ থেকে ছ’মিনিট। এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘বন্দে মাতরম পুরোটা গাইতে সময় লাগে তিন মিনিট দশ সেকেন্ড। জনগণমন গাওয়ার সময়সীমা ৫২ সেকেন্ড। অর্থাৎ, এই দু’টি গান গাইতেই সময় লেগে যায় চার মিনিট দু’সেকেন্ড। দু’টি গানের মাঝে কিছুটা সময় যায়। এর পরে যদি স্কুলের নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে হয়, তা হলে কি যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে?’’
ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক রাজা দে-র মতে, ‘‘নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে না-হয় আগের সরকারের রাজ্য সঙ্গীত ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’প্রার্থনা থেকে বাদই দিলাম। কিন্তু স্কুলের নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত অনেক স্কুলই বাদ দিতে চাইবে না। কারণ, অনেক স্কুলের ক্ষেত্রেই নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত তাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের স্কুলেরও তো নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত রয়েছে। প্রার্থনারনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এতগুলি গান গাওয়া সম্ভব নয় বলেই আমাদের মনে হয়েছে।’’ রাজা জানাচ্ছেন, স্কুলের পড়ুয়াদের বা স্কুলের কোনও সাফল্য এই প্রার্থনা সভাতেই সমস্ত পড়ুয়ার সামনে ঘোষণা করা হয়।তাতেও কিছুটা সময় লেগে যায়। তাঁর প্রশ্ন, পর পর তিনটে গান গাওয়ার পরে কি এই সব ঘোষণার সময় পাওয়া যাবে?
আর একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায় লেখা আছে, স্কুলে বন্দে মাতরম গাওয়া যেতে পারে। সেটি কিন্তু বাধ্যতামূলক করাহয়নি। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা হয়েছিল। শীর্ষ আদালত বলেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বন্দে মাতরমকে স্কুলে বাধ্যতামূলক করেনি। তাই ওই মামলা তারা খারিজ করে দেয়।’’ ওই প্রধান শিক্ষকের কথায়, ‘‘এই রাজ্যে তো এখন ডাবল ইঞ্জিনসরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যদি বন্দে মাতরম স্কুলে বাধ্যতামূলক করে না থাকে, তা হলে রাজ্য সরকার কেন বলছে, সেটি বাধ্যতামূলক?’’ ‘কলেজিয়াম অব অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার্স অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেসেস'-এর সম্পাদক সৌদীপ্ত দাস বললেন, ‘‘স্কুলের প্রার্থনার সময়ের কথা চিন্তা করে বন্দে মাতরমের প্রথম দু’টি স্তবক বরং গাওয়া হোক। স্কুলে বিশেষ অনুষ্ঠানে না-হয় বন্দে মাতরমের ছ’টি স্তবক গাওয়া যেতে পারে।’’
এই বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হলে বিকাশ ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, আপাতত সরকারি নির্দেশ অনুযায়ীই সব কাজ হচ্ছে। স্কুল খোলার পরে পরবর্তী নির্দেশ কিছু এলে সেই মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)