পরনে গোলাপি শার্ট। তার উপর জড়ানো ছাইরঙা ব্লেজ়ার। সঙ্গে ধূসর রঙের ট্রাউজ়ার্স। হাতে মুঠোফোন। মুখে স্মিত হাসি। ৫১ বছর বয়সি মহিলার নাম মেনকা গুরুস্বামী। যিনি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে নতুন ইতিহাস লেখার আনুষ্ঠানিক সূচনা করলেন বৃহস্পতিবার। যে ইতিহাসের ‘ভিত্তিপ্রস্তর’ স্থাপন করল তৃণমূল।
রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে বাকি তিন জনের সঙ্গে মনোনয়ন জমা দিলেন মেনকা। দেশের প্রথম ঘোষিত সমকামী সাংসদ হিসাবে সংসদের উচ্চকক্ষে যাচ্ছেন তিনি। মনোনয়নের সময়েও মেনকার পাশে ছিলেন তাঁর সঙ্গিনী অরুন্ধতী কাটজু। যে অরুন্ধতীর সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে একত্রবাস করছেন সুপ্রিম কোর্টের দুঁদে আইনজীবী মেনকা।
প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতা নিয়ে প্রগতিশীল ভাষ্য এখন অনেক দলই রাখে। কিন্তু সংসদীয় পরিসরে তাকে স্বীকৃত দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলই প্রথম দল হিসাবে এই দৃষ্টান্ত তৈরি করল। বিজেপির জমানায় এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত অনেকের। ঘটনাচক্রে, মেনকার বাবা মোহন গুরুস্বামী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ। ঘটনাচক্রে, নির্বাচন কমিশনের সিলমোহর অনুযায়ী তৃণমূল এখন জাতীয় দল নয়। আঞ্চলিক দল। এবং আঞ্চলিক দল হয়েও সর্বভারতীয় স্তরে মাইলফলক তৈরি করল তারা।
মনোনয়নপত্র দাখিল করার পরে মেনকা বলেন, “এটি আমার কাছে বিরাট সম্মানের বিষয়। একজন আইনজীবী হিসাবে, বিশেষ করে একজন সংবিধান বিষয়ক আইনজীবী হিসাবে সংসদের উচ্চকক্ষে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই উচ্চকক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা সবাই জানেন আমাদের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা, সমতা ও বৈষম্যহীনতার মূল্যবোধের কথা বলে। সংসদে প্রতি দিন আমার কাজের মাধ্যমে আমি সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধকে রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করব।’’
নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্টে আলোচিত নাম মেনকা। তাঁর করা অন্যতম সমকামিতা সংক্রান্ত মামলা যা ‘নভতেজ সিংহ জোহর বনাম ভারত সরকার’ মামলা হিসাবে যা সুপ্রিম কোর্টে নথিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। এই মামলায় মেনকা আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হত। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায়ে ওই ধারার যে অংশ প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ বলত, তা বাতিল করে দেয়। এই মামলায় মেনকার যুক্তি ও আইনি ব্যাখ্যা আদালতের রায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল বলে আইনি মহলে মত রয়েছে। ঘটনাচক্রে, সে বছর থেকেই একত্রবাস করছেন মেনকা এবং অরুন্ধতী।
এ ছাড়াও আধার প্রকল্প সংক্রান্ত মামলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মেনকা। বিচারপতি কেএস পুট্টুস্বামী বনাম বনাম ভারত সরকারের মামলায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিস্তর বিতর্ক হয়। এই মামলার শুনানিতে মেনকা তাঁর সওয়ালে গোপনীয়তার অধিকারের সাংবিধানিক গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়াও জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে করা তাঁর মামলা সুপ্রিম কোর্টে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলেই মত আইন মহলের। এত দিন সংবিধান বিষয়ক তাঁর লড়াই আদালতে সীমাবদ্ধ ছিল। এ বার সেই লড়াই পৌঁছে যাবে আইনসভায়। সৌজন্যে তৃণমূল।