Advertisement
E-Paper

দুর্নীতি এবং হিংসার অভিযোগ, গত সাত দিনে তৃণমূল নেতাদের গ্রেফতারির সংখ্যা ছাড়াল ৭০! শুধু শনিবারই রাজ্য জুড়ে ধৃত ১৬

ধৃতদের মধ্যে ‘বড় মুখ’ অবশ্যই প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু। দুর্নীতি মামলায় তিনি ইডির হাতে গ্রেফতার হলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েক জন কাউন্সিলর গ্রেফতার হয়েছেন পুলিশের হাতে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ২০:৩৮

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মোটামুটি একই— আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ নয়ছয়, হিসাব বহির্ভূত আয়, সাধারণ মানুষকে হুমকি, মারধর। কেউ কেউ অবশ্য ভোট-পরবর্তী বা পূর্ববর্তী হিংসায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত বলে অভিযোগ। তাঁরা সকলেই তৃণমূল। গত সাত দিনে ৭০ জনের বেশি। ধৃতদের মধ্যে ‘বড় মুখ’ অবশ্যই প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু। দুর্নীতি মামলায় তিনি ইডির হাতে গ্রেফতার হলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েক জন কাউন্সিলর গ্রেফতার হয়েছেন পুলিশের হাতে। শুধু শনিবারই রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের অন্তত ১৬ জন গ্রেফতার হয়েছেন।

শনিবার কলকাতা এবং বিধাননগর জুড়ে গ্রেফতার হয়েছেন সাত জন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম সম্রাট বড়ুয়া। বিধাননগর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এই তৃণমূল কাউন্সিলর প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সির স্বামী তৃণমূল কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তোলাবাজির অভিযোগে বাগুইআটি থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। এ ছাড়াও তৃণমূল নেতারা গ্রেফতার হয়েছেন হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং কোচবিহারে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান গুরুপদ মাঝি এবং তাঁর ভাই রাজু মাঝি। গ্রামীণ হাওড়ার জগৎবল্লভপুর থানার পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করেছে। বিজেপি কর্মীদের উপর হামলা মারধর এবং দোকানপাট, বাড়িঘর ভাঙচুরের মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

হুগলির দাদপুর থানার পুলিশ হারিট গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য আলতাব হোসেন মল্লিককে গ্রেফতার করেছে শনিবার। ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় অভিযুক্ত তিনি। পাশাপাশি, হুগলির কোন্নগর পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর বাবলু পাল ওরফে খোকন গ্রেফতার হয়েছেন। সরকারি জমি দখল করে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় তৈরি, অবৈধ ব্যবসা এবং সরকারি জমির নকল দলিল তৈরি করে বিক্রি করার মতো গুরুতর সমস্ত অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। উত্তরপাড়ার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর উপস্থিতিতে বাবলুকে উত্তরপাড়া থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, আগেও অনেক বার পুলিশ-প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু বাবলু অদ্ভুত ভাবে ছাড় পেয়ে গিয়েছেন। বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এতদিন পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয়নি সেনিয়ে প্রশ্ন তোলেন ধৃত তৃণমূল কাউন্সিলর সম্পর্কে বিজেপি বিধায়ক বলেন, ‘‘২০ বছর ধরে সরকারি জমি দখল করে রেখেছিলেন। বেআইনি নির্মাণে আবার বুলডোজ়ার চলবে এখানে। আর তার খরচ নেওয়া হবে তৃনমূল কাউন্সিলরের থেকেই।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘উনি এলাকার মানুষকে হুমকি দিতেন তার এক পকেটে নাকি পুলিশ আর এক পকেটে চেয়ারম্যান স্বপন দাস আছেন। কত বড় পকেট জানি না। তবে সেই পকেট এ বার সিল করে দিলাম।’’

নদিয়ার আড়ংঘাটায় গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূল নেতা রমজান আলি মণ্ডল। হাবভাব দেখে ‘আড়ংঘাটার শাহজাহন শেখ’ বলে কটাক্ষ করতেন বিরোধীরা। তৃণমূল জমানায় এলাকায় ‘প্রভাবশালী’ বলে পরিচিত ওই তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে সমান্তরাল প্রশাসন চালাতেন রমজান। শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার থেকে অন্যের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি, ওই এলাকায় কেউ বাড়ি বা দোকান নির্মাণ করতে গেলে তাঁদের রমজানের ‘সিন্ডিকেট’ থেকেই চড়া দামে বালি, সিমেন্ট, পাথর কিনতে হত বলে অভিযোগ। ওই এলাকার বাসিন্দা রাজকুমার চৌধুরীর আড়ংঘাটা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে রমজানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তার পরেই গ্রেফতার করা হয়েছে রমজানের ‘ডানহাত’ প্রদীপ সাঁতরাকে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। ধৃতদের হেফাজতে চেয়ে শনিবারই রানাঘাট আদালতে হাজির করিয়েছে ধানতলা থানার পুলিশ।

মুর্শিদাবাদেরই বড়ঞায় গ্রেফতার হয়েছেন আর এক ‘দাপুটে’ তৃণমূল নেতা। তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক যুবকের উপর হামলার অভিযোগ। ধৃত আবু বক্কর একাধিক অপরাধমূলক মামলায় জড়িত বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে খবর, কিছু দিন আগেই বড়ঞার কুলি চৌরাস্তা এলাকায় সেলিম বারি নামে এক যুবককে তিনি খুনের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। ধৃত তৃণমূল নেতা কুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান জেসমিন আহমেদের স্বামী। কুলি চৌরাস্তা সাধারণ বিদ্যাপীঠে অস্থায়ী শিক্ষক হিসাবেও কর্মরত ছিলেন তিনি।

অবশেষে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বড়ঞা থানার পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে আবুবাক্কারকে গ্রেফতার করে। পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ধৃতের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাঁকে কান্দি মহকুমা আদালতে তোলা হবে। এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে কুলি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বরে ভোটের সময় সন্ত্রাস, অন্য সময়ে দুর্নীতি এবং তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য শেখ কামরুদ্দিন। কয়েক দিন আগে পাণ্ডবেশ্বরের ছোড়া পঞ্চায়েতের প্রধান সন্ত্রাস এবং দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। শনিবার রাতে গ্রেফতার হলেন সদস্য। ধৃত ব্যক্তি পাণ্ডবেশ্বর দক্ষিণ শ্যামলা কোলিয়ারির শ্রমিক সংগঠনের সম্পাদকও বটে। কামরুদ্দিনের দাবি, তিনি নির্দোষ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই তাঁকে গ্রেফতার করিয়েছে বিজেপি।

কোচবিহারের দিনহাটা পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রধান-সহ দু’জনের গ্রেফতারির পর এ বার প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পঞ্চায়েতের উপপ্রধান গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিজেপি কর্মীকে তৃণমূল কার্যালয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে খবর, এ বার বিধানসভা ভোট মিটতেই দিনহাটার বিজেপি কর্মী অজয় অধিকারীকে মারধর করা হয়। তাঁকে প্রাণে মেরার হুমকি দেন দিনহাটা-২ ব্লকের বড় শাকদল গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভবরঞ্জন বর্মণের বিরুদ্ধে। শুক্রবার গভীর রাতে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। শনিবার আদালতে জামিনের আবেদন করেছিলেন তৃণমূলের ভবরঞ্জন। কিন্তু বিচারক তাঁর ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। দিনহাটা আদালতের সরকারি আইনজীবী নিহাররঞ্জন গুপ্ত বলেন, ‘‘অজয় অধিকারী সাহেবগঞ্জ থানা একটি অভিযোগ দায়ের করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফলঘোষণার পর ভবরঞ্জন বর্মণ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছেন এবং ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ। সেই টাকা না দেওয়ায় তাঁর প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সাহেবগঞ্জ থানার পুলিশ ভবরঞ্জনকে গ্রেফতার করে এবং আদালতে হাজির করায়।’’

TMC Leaders TMC bjp-tmc BJP
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy