Advertisement
E-Paper

বদলাচ্ছে নিয়ম, নিয়োগে স্বচ্ছতা এনে দুর্নীতির কালি মুছতে চান শুভেন্দু! ‘স্বাগত’ বলেও তৃণমূলের নিট-খোঁচা, কী বলছেন অন্যেরা

তৃণমূল জমানায় নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়েছে, তখন আদালত থেকে রাজনীতির পরিসরে যে শব্দবন্ধ নিয়ে সব থেকে বেশি চর্চা ছিল, তা ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, যে দুর্নীতি হয়েছে, তার নেপথ্যে ছিল প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ১৯:২৯
Suvendu Adhikari government will change the rules to prevent corruption in recruitment, what is the reaction of different sectors

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দুর্নীতির কালির পুরু পোঁচ পড়েছে তৃণমূল জমানায় নিয়োগ ব্যবস্থায়। আপাতত নিয়ম বদলে সেই কালি মোছাই যে নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য, তা শনিবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, খাদে নিমজ্জিত নিয়োগ ব্যবস্থাকে তুলে আনতে পরীক্ষা প্রক্রিয়াতেই বিবিধ বদল আনা হবে। সেই বদল কেমন, এক-দুই-তিন করে উদাহরণও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে শুভেন্দুর এই বক্তব্যকে বিভিন্ন মহল ‘স্বাগত’ জানালেও, তা কার্যকর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার কথা বলছে তারা। এমনকি, যাদের শাসনে পশ্চিমবঙ্গে স্কুল থেকে পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি ‘সংক্রমণ’-এর আকার নিয়েছিল, সেই তৃণমূলও শুভেন্দুর বক্তব্যকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে নিট পরীক্ষা নিয়ে খোঁচাও দিয়েছে।

শনিবার শিয়ালদহে অনুষ্ঠিত রোজগার মেলায় যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, ‘‘আপনারা জানেন পশ্চিমবঙ্গের বদনাম হয়ে গিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পুরনিয়োগ দুর্নীতি, হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল— নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যের অনেক ক্ষতি হয়েছে।’’ তার পরেই তিনি জানান, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার সরকারি স্তরে এবং সরকারপোষিত বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগ নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনে নিয়োগ নিয়ে নতুন আইন আনা হবে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু। আগের সরকারের আমলে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু সেটা কমানো উচিত বলেই মনে করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। স্বচ্ছতার সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা, অ্যাকাডেমিক মূল্যায়ন, মৌখিকের নম্বর কম করে লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর, ওএমআর শিটের কার্বন কপি পরীক্ষার্থীদের দেওয়ার মতো পদক্ষেপের কথা বলেছেন তিনি।

তৃণমূল জমানায় নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়েছে, তখন আদালত থেকে রাজনীতির পরিসরে যে শব্দবন্ধ নিয়ে সব থেকে বেশি চর্চা ছিল, তা ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, যে দুর্নীতি হয়েছে, তার নেপথ্যে ছিল প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা। প্রাথমিক থেকে উচ্চ প্রাথমিক কিংবা পুরসভা— সর্বত্রই সেই প্রসঙ্গ এসেছে। আদালতে এ-ও উল্লিখিত হয়েছিল, দালাল থেকে এসএসসির কর্তা, মন্ত্রী থেকে গোটা ব্যবস্থা মিলেমিশে দুর্নীতির নীল নকশা এঁকেছিল। শুভেন্দু দুর্নীতি নির্মূলের পন্থা হিসাবে নিয়ম বদলকেই আপাতত তাঁর সরকারের বর্শাফলক করতে চাইছেন। তবে শুধু নিয়ম বদলে কতটা দুর্নীতি রোখা যাবে, সেই প্রশ্ন উঠছে দুর্নীতির কারণে চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের মধ্যেও।

চাকরিহারা শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল বলেন, ‘‘মৌখিকে নম্বর কমলে কি স্বজনপোষণ কমবে?’’ সেই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৫ সালে এসএসসি যে নিয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষা নিয়েছিল, তাতেও ওএমআর শিটের কার্বন কপি পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছিল। ফলে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু যা বলেছেন, তা নতুন নয় বলেই দাবি চিন্ময়ের। সেই সঙ্গে তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি দিয়ে দুর্নীতি রোধ করা যায় না। সঠিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ, নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি যদি না-থাকে, তা হলে নিয়োগ দুর্নীতি এড়ানো সম্ভব না। আগেও যেখানে পরীক্ষায় কোনও গন্ডগোল হয়নি, পরে সিস্টেমে গন্ডগোল করা হয়েছে। সিস্টেমটা পাল্টাতে হবে। আধিকারিকদের উপরেও নজরদারি দরকার।’’ তবে তিনি আশাবাদী, নতুন সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎও চাইছেন চাকরিহারারা। চিন্ময়ের কথায়, ‘‘আমরা যোগ্য চাকরিহারারা মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছি। আমাদের ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ কী হবে সেই বিষয়ে আলোচনা চাইছি।’’

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ধারাবাহিক ভাবে সওয়াল করে গিয়েছেন আইনজীবী তথা রাজ্যসভায় প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর নিয়ম বদলের বার্তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘নিয়োগ প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ হয় তার জন্যই তো আমাদের লড়াই। সেটা যদি করতে পারেন, তা হলে তাকে স্বাগত জানাব। তবে শুধু মুখে বললে হবে না। বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।’’

শিক্ষাবিদ তথা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান প্রশান্ত রায়ও মুখ্যমন্ত্রীর ভাবনাকে ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘দুর্নীতির বিষয়টি অনেকটা গভীরে প্রোথিত। তাকে উপড়ে ফেলতে নতুন সরকার যে কাজ করবে সেটা সহজেই অনুমেয়। কারণ, আগের শাসকদলের হার এবং বর্তমান শাসকদলের জয়ের অন্যতম কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, ক্রোধ। কিন্তু নতুন সরকার কতটা বাস্তবায়িত করতে পারছে, তা আমাদের দেখতে হবে।’’

তৃণমূল অবশ্য খোঁচা দিতে ছাড়েনি। শাসকদলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারীর এ হেন চিন্তাভাবনাকে স্বাগত জানাই। তবে একই সঙ্গে তাঁর কাছে প্রশ্ন রইল, তিনি কি ঘুরিয়ে নিটের দুর্নীতি বা মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির দিকেও আঙুল তুলতে চাইলেন? সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি একই রকম সরব থাকেন, তা হলে স্বাগত।’’

WB State Government Suvendu Adhikari Recruitment
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy