E-Paper

ঝাড়খণ্ড থেকে ছোট দলে এসে ঘরভাড়া নিয়ে থাকে, অপরাধ করেই পলায়ন, কী ভাবে রোখা যাবে কুন্দনদের

উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, সোনাপুর হয়ে শিলিগুড়িতে বিহারের দুষ্কৃতীদের আনাগোনা অনেক পুরনো। এ ছাড়া, গলগলিয়া, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি হয়েও ভিন্ন রাজ্যের লোক ঢোকে৷

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৭:১২
kundan Yadav

কুন্দন যাদব। —ফাইল চিত্র।

ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং মালদহ— রাজ্যের ছ’টি জেলার সীমানা ছুঁয়ে রয়েছে ঝাড়খণ্ড। আবার মালদহের একাংশ, উত্তর দিনাজপুর ঘেঁষে রয়েছে বিহার। সীমানা লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, নানা রাস্তায় পুলিশ নাকাবন্দি করে। কিন্তু ভিন্‌ রাজ্য থেকে অবাধে লোক ঢোকা আটকায় না। গত ছ’মাসে এ রাজ্যে এসে ভিন্‌ রাজ্যের সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য যে ভাবে বেড়েছে, তা চিন্তা বাড়াচ্ছে লোকসভা ভোটের আগে।

উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, সোনাপুর হয়ে শিলিগুড়িতে বিহারের দুষ্কৃতীদের আনাগোনা অনেক পুরনো। এ ছাড়া, গলগলিয়া, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি হয়েও ভিন্ন রাজ্যের লোক ঢোকে৷ প্রতি শনি-রবিবার বিহার থেকে শ’য়ে-শ’য়ে গাড়ি আসে শিলিগুড়ির বিভিন্ন পানশালায়৷ সেখানে অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি, গোলমাল, মারপিট আকছার লেগে থাকে। সম্প্রতি শিলিগুড়ির কাছে রাঙাপানি এলাকায় এটিএম তুলে নিয়ে যাওয়া, মাটিগাড়ায় গাড়ির শো-রুমে ডাকাতি থেকে বাগডোগরায় ব্যাঙ্ক লুট, শিলিগুড়ির বর্ধমান রোডের সোনার বন্ধক রাখা সংস্থায় হানার ক্ষেত্রেও ভিন্ রাজ্যের দুষ্কৃতীরা জড়িত ছিল।

একই ভাবে মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর থেকেও খুব সহজে যাওয়া যায় বিহারে। আবার মানিকচক থেকে গঙ্গা টপকালেই ঝাড়খণ্ড। পুলিশের দাবি, চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মানিকচক, মোথাবাড়িতে এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে বাংলার সঙ্গে বিহার বা ঝাড়খণ্ডের মানুষও বাস করেন। যাতায়াতের পক্ষে দুর্গম গ্রামগুলিতে নিয়মিত নজরদারিও সম্ভব নয়। পুলিশ সূত্রের দাবি, দুষ্কৃতীদের সে ‘রুট’ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা থেকেও সহজে ঝাড়খণ্ডে যাতায়াত করা যায়।

পুলিশ সূত্রেই বলা হচ্ছে, ঝাড়খণ্ড থেকে বীরভূমে ঢোকার ১৩টি ‘পয়েন্ট’ রয়েছে। সেখানে নিয়মিত নাকা-তল্লাশি চালায় পুলিশ। জেলা পুলিশের এক কর্তা অবশ্য জানাচ্ছেন, ঝাড়খণ্ড থেকে ছোট ছোট দল গড়ে ব্যবসার নাম করে কিছু দিন জেলায় এসে ঘরভাড়া বা হোটেলে থাকে দুষ্কৃতীরা। ‘রেকি’ করার পরে অপরাধ করে পালিয়ে যায়। ঝাড়খণ্ডের শিকারিপাড়া থেকে রামপুরহাট এবং মহমম্মদবাজার থেকে মশানজোড় রোড হয়েই মূলত তাদের যাতায়াত। তবে রাজনগর-সহ অন্য কয়েকটি এলাকা দিয়েও আসা-যাওয়া চলে।

পুরুলিয়ার সীমানায় ৩৮০ কিমি জুড়ে রয়েছে ঝাড়খণ্ড। পুরুলিয়া শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলার সীমানা। বিভিন্ন সময়ে ব্যাঙ্ক বা পেট্রল পাম্পে ডাকাতি, খুনের ঘটনায় ঝাড়খণ্ড-যোগ খুঁজে পেয়েছে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ। জেলার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘২৯ অগস্ট স্বর্ণ বিপণিতে ডাকাতির ১৮ মিনিটের মধ্যে পুলিশ খবর পেয়েছিল। কিন্তু পুরুলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে, ওই সময়টুকুই দুষ্কৃতীদের ঝড়খণ্ডে ঢুকে পড়ার পক্ষে যথেষ্ট!’’

ঝাড়খণ্ড থেকে পশ্চিম বর্ধমান হয়ে এ রাজ্যে ঢোকার পাঁচটি সড়কপথ রয়েছে, জানাচ্ছে জেলা পুলিশ। বারাবনির রুনাকুড়া ঘাট, বরাকরের ডুবুরডিহি ও বেগুনিয়া, রূপনারায়ণপুরে বিহার রোড এবং চিত্তরঞ্জনের ১ নম্বর গেট। রেলশহর চিত্তরঞ্জনে আরপিএফের নজরদারি চলে। রয়েছে প্রচুর সিসি ক্যামেরাও। তবু নানা সময়ে এই পথে দুষ্কৃতী আনাগোনার প্রমাণ মিলেছে বলে এলাকাবাসীর একাংশের দাবি। বরাকরে ডুবুরডিহি ও বেগুনিয়ার চেকপোস্টেও পুলিশের কড়া পাহারা রয়েছে। তবু এই এলাকা দিয়ে অনেক সময়ে দুষ্কৃতী ঢোকার খবর মেলে। পুলিশ সূত্রের দাবি, তার কারণ, দুষ্কৃতীরা সেতু পেরিয়ে চেক পোস্ট অতিক্রম করে না। তারা লাগোয়া জঙ্গলের রাস্তা বা নদীপথ ধরে। বছরের অনেকটা সময় জল কম থাকায়, হেঁটে নদী পেরিয়ে যাতায়াত অনেক নির্ঝঞ্ঝাটে হয়। পুলিশের আবার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে দুষ্কৃতীদের জেরা করে জানা গিয়েছে, তারা রেলেও ঝাড়খণ্ড থেকে যাতায়াত করে থাকে।

অপকর্ম করে দুষ্কৃতীরা শুধু যে বিহার বা ঝাড়খণ্ডের রাস্তাই ধরে, তা নয়। নদিয়া-মুর্শিদাবাদে অনেক ক্ষেত্রে আততায়ীদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে গা-ঢাকা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে পুলিশের অনুমান। ২০১৫-র মার্চে রানাঘাটের গাংনাপুরে ডাকাতি করতে এসে বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীকে গণধর্ষণ করে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা। আবার, সদ্য পঞ্চায়েত ভোটের আগেই পুলিশ পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে চাপড়ার অমিতাভ বিশ্বাসকে ধরে। নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ পাচারের পান্ডা অমিতাভ বাংলাদেশে গা-ঢাকা দিয়ে পাচার-চক্র চালাত বলে অভিযোগ। দিন কয়েক আগে চাপড়ায় ধরা পড়া ‘হাত-কাটা’ মাসুদ ও তার দলবলও নদিয়ায় অপরাধ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিত বলে পুলিশ জেনেছে।

লোকসভা ভোটের মুখে দুষ্কৃতী-আনাগোনা সামাল দেওয়ার আদৌ কি কোনও পরিকল্পনা রয়েছে? পুলিশ সূত্রের দাবি, বিধানসভা বা লোকসভা ভোটের আগে বাড়তি নজরদারি চালানো হয়। শুধু ভোট নয়, যে কোনও উৎসব-অনুষ্ঠান বা স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনগুলির আগে টানা পুলিশি অভিযান চলে। দুষ্কৃতী আনাগোনা ঠেকাতে অন্য রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যৌথ সমন্বয়ে বৈঠকও করা হয়। সম্প্রতি সীমানা বরাবর বেশ কিছু সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

কিন্তু সিসি ক্যামেরা বসানো আর নাকা-তল্লাশিই কি কুন্দন যাদবদের মতো দুষ্কৃতীদের ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট? ঘটনা পরম্পরা দেখে সেই নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Crime Lok Sabha Election 2024

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy