E-Paper

নর্দমার গন্ধা পানিতে চটকলে মুছেছে ধর্মের বিভাজন

ধর্ম না পেটের খিদে, কোন লড়াই এ বার? কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বসতিতে খোঁজ নিলেন ঋজু বসু।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮
বর্জ্যের নর্দমা উপচে বর্ষায় কাঁকিনাড়া কুলিলাইনের এই গলি হয়ে ওঠে নদী।

বর্জ্যের নর্দমা উপচে বর্ষায় কাঁকিনাড়া কুলিলাইনের এই গলি হয়ে ওঠে নদী। — নিজস্ব চিত্র।

চট কলের কুলি লাইনের দু’ধারে সারিবদ্ধ ঘরের মাঝে চিলতে সুতোর মতো গলি। পাশাপাশি দু’জন লোক হেঁটে যাবে কোনও মতে। খুপরি ঘরের উঠোন ঘেঁষে সেই গলির নীচেই বয়ে চলেছে খোলা নর্দমা। সামান‍্য বৃষ্টির ছোঁয়াচ পেলেই যা নদীহয়ে ওঠে।

বছর সাতেক আগে লোকসভা ভোটের আবহে তেতে উঠেছিল কাঁকিনাড়া চটকলের এই কুলি লাইন। বোমাবাজি, আততায়ীর ধারালো অস্ত্র, পুলিশের গুলি মিলিয়ে গোটা ভাটপাড়ায় প্রাণ যায় ১২-১৩ জনের। কত যে ঘর-বাড়ি মাটিতে মিশেছে, গরিবের সংসার লুট হয়েছে, ইয়ত্তা নেই তার। ২০২৪-এ প্রথম ভোট দেওয়া সাইমা পারভিন, প্রথম ভোটার কার্ডের অনলাইন-অফলাইন আবেদন সেরে অপেক্ষারত রুকসার পারভিনেরা বলেন, এখনও ‘থোড়া সা গরমাপন’ দেখলেই ভয় করে তাঁদের। লোকমুখে এ তল্লাট হল, বর্ডার এরিয়া! দেশের সীমান্ত ত্রিসীমানায় নেই। তবু বর্ডার। চটকলের হিন্দু, মুসলিম মজুরদের কোয়ার্টার পাশাপাশি চলে এলেই কুলি লাইনের সেই অংশ মুখে মুখে বর্ডার বলে চিহ্নিত হয়।

চটকলে রুকসারদের ছ’নম্বর লাইনে ৩০টার মধ্যে ২৯টা ঘরই মুসলিমদের। গা ঘেঁষা পাশের গলিতে এর পরের দুটো লাইনে আবার ৩৬ ঘর করে শুধুই হিন্দুদের বাস। ঘর লাগোয়া খাটালে গরু দেখলে বুঝে নেবেন, তা বিহারি যাদবদের বাস। চোখেমুখে কথা বলা নৈহাটি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজের রুকসার টরটরিয়ে বলেন, “এত যে খুনখারাবি, লুটপাট, বাইরের লোকের বিষে পাড়াপড়শির মুখ দেখাদেখি বন্ধ হল, আমাদের ঘরের ফাঁকের নর্দমা কিন্তু সবাইকে মিলিয়ে দিয়েছে। বারিষ একটু বেশি ক্ষণ হলেই পিছনে পায়খানার লাইনের জল ড্রেনে এসে ঢুকবে। সেই নোংরা জলের সঙ্গে গরুর গোবর, হিন্দু-মুসলিম সবার টাট্টি আমাদের ঘরেই থই থই করে!”

নোংরা খোলা নর্দমার মাধ‍্যমে এমন নির্ভেজাল ‘মিলন সেতু’র কথা বলতে একটু করুণ হাসিও খেলে যায় একুশের কলেজছাত্রীর ঠোঁটে। রুকসার, তাঁর দিদি হেনা, মুসারাত, ভাই ইমরানেরা কিংবা পাশের গলির বলরাম যাদব, বিনোদ, প্রমোদ, রামবিলাস যাদবেরা এক কথাই বলেন, “নরকে বাস করছি বছরের পর বছর। ভোটের সময়ে বাইরের লোক এসে হিন্দু, মুসলিমের মনে বিষ ঢোকায়, কিন্তু চটকলের গরিবদের জীবন একই যন্ত্রণায় ডুবে।”

শুধু কাঁকিনাড়া চটকল নয়, বাঙালি শ্রমিক প্রধান ভাটপাড়া জুটমিল, নদিয়া চটকল বা জগদ্দলের দিকের অকল‍্যান্ড কি জগদ্দল চটকল, এআই চাঁপদানি ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আরও নানা চটকলেও একই দশা শ্রমিকদের। অথচ সেই আদ‍্যিকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে কলকাতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই নাকি নিকাশি লাইন তৈরি হয় ভাটপাড়াতেও। এখন আগরপাড়া থেকে টিটাগড়, নৈহাটি, কাঁচরাপাড়ার চটকলের শ্রমিক বসতিরই এমন দুরবস্থা। স্থানীয়দের হিসেব, এক একটি চটকলে হাজার দশেক শ্রমিক থাকলে তাঁদের পরিজনসুদ্ধ কম করে ৩০-৪০ হাজার জন একটু বৃষ্টিতে ঘরে নিজেদের পুরীষ-মাখামাখি অবস্থায় থাকতে বাধ‍্য হন।

২০১৯-এর গোলমালে মুখে গামছা-বাঁধা লুটেরারা রুকসারের মায়ের মাথায় বন্দুক চেপে ধরে। খুলে নেয় সোনার গয়না, নানির উপহার মঙ্গলসূত্র। ভাতের থালা, ভাইবোনেদের স্কুলের বই ছিঁড়ে নর্দমায় ছুড়ে ফেলে। রুকসারের বন্ধু সঞ্জনা সাউ-রা সে-বার গ্রীষ্মের ছুটিতে জগদ্দল ও কাঁকিনাড়ার মাঝে বড়াইপাড়ার ভাড়াবাড়িতে ফেরেন। দিল্লিতে মাটির নীচের জল তোলার শ্রমিক সঞ্জনার বাবা প্রেম সাউ গোলমালের সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। পুলিশের গুলিতে বেঘোরে প্রাণ হারান। সঞ্জনাদের চার বোনের মা শ‍্যামলী এখন ভাটপাড়া অঞ্চলেই লোকের বাড়ি কাজ করেন। কাঁচরাপাড়ার স্কুলে সপ্রতিভ দ্বাদশ শ্রেণি সঞ্জনাই বলল, “বাবা গুলি খাওয়ার পরে ওঁর ক্রিয়াকর্মের খরচও আমাদের ছিল না। তখন ভাটপাড়া পুরসভার চেয়ার‍ম‍্যান অর্জুন সিংহ মাকে চাকরি দেবেন বলেন। চাকরি বা সরকারি ক্ষতিপূরণ, কিছুই শেষ পর্যন্ত পাইনি!”

ভাটপাড়া পুর এলাকায় নিকাশি সমস‍্যা থেকে গোষ্ঠী সংঘর্ষে নিহত, আহত হিন্দু, মুসলিমের ক্ষতিপূরণ—সব কিছুর দায় রাজ‍্যের শাসক দলের উপরে চাপান প্রাক্তন সাংসদ, তৃণমূল ঘুরে অধুনা বিজেপিভুক্ত অর্জুন। বলেন, “বাম আমলে বিদ‍্যুৎ গঙ্গোপাধ‍্যায় এবং পরে আমি গঙ্গা অ‍্যাকশন প্ল‍্যানের টাকায় চটকলের নিকাশি লাইন সারানোর চেষ্টা করি। এখন পুরসভা তৃণমূলের। ওরা কিচ্ছু করছে না।” এখনকার তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক বলেন, “কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহকে চটকল নিয়ে চিঠি লিখেছি। সাড়া মেলেনি।”

স্থানীয় বাসিন্দা, সমাজকর্মী বিজয় রজক বছর কুড়ি আগে মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন সভাপতি শ্যামল সেনকে চটকলের নিকাশির হাল নিয়ে চিঠি লেখেন। তিনি বলছেন, “রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নিকাশি লাইনের অবস্থা এখনও আরও খারাপ হয়েছে। শৌচালয়ের ভিতরে বৃষ্টির জল ঢোকা বন্ধ করতে সদ‍্য ছাদ ঢালাই হয়েছে।”

লাগাতার উস্কানি ও বিভাজনের রাজনীতিতে ধ্বস্ত ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ায় বোমাগুলির নিত‍্য দুর্যোগ কিন্তু অদ্ভুত ভাবে দুর্ভোগের শিকার সঞ্জনা, রঞ্জনা, রুকসার, সাইমা, আবিদাদের কাছাকাছি এনেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘আমরা, একটি সচেতন প্রয়াস’-এর তথ‍্যানুসন্ধানে উঠে আসছে, রাজনীতির উস্কানিতে ভাটপাড়ায় নষ্ট হচ্ছে হিন্দু-মুসলিমের স্বাভাবিক সৌহার্দ্য। সংঘাত ও শত্রুতার আবহে চাপা পড়ে যাচ্ছে, ন‍্যূনতম নাগরিক অধিকার। ‘বিজয়-চাচা’দের ‘ভাটপাড়া পিস সেন্টারে’ এখন নিয়মিত কম্পিউটারে তালিম নিতে আসে হিন্দু, মুসলিম কিশোর, তরুণেরা। সাইমা, সঞ্জনারা ঘন হয়ে বসে ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ার কয়েক বছর আগের রামনবমীর গল্প শোনেন। বিজয় বলেন, “তখন মুসলিমরা রামনবমীতে ‘ল‍্যাজ ঝোলানো হনুমান, ঝাঁসির রানি, শিবাজী’দের দেখতে ঝেঁটিয়ে ভিড় করত। রাম-লক্ষ্মণের হাতেও কাগজের তরোয়াল থাকত। ‘জয় শ্রীরাম’ নয়, ‘জয় সিয়ারাম’ বলা হত! ডিজে ছিল না। কিন্তু প্রাণের আনন্দ ছিল। ৮-১০ বছরে সব কেমন পাল্টে যাচ্ছে।”

চটকলের হতদরিদ্র ঘরে সামান‍্য শিক্ষার ছোঁয়াচ পাওয়া তরুণ মনেও তীব্র অভিঘাত রেখে যাচ্ছে সংঘাতের রাজনীতি। যাদের ভোটের বয়স হল, কিংবা হতে চলেছে, কেউই ভেবে পায় না, প্রাপ‍্য অধিকার ছিনিয়ে নিতে এ সঙ্কটে কাকে বেছে নিলে ভাল হবে! ২০২৫-এ বৃষ্টি বেশি হয়েছিল। ঘরে গন্ধা পানিও ঢুকেছি বেশি। নর্দমা ও রাজনীতির পঙ্কিল স্রোত মিশে যায় নবীন চেতনায়।

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Religions Unity sewage system Slums

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy