Advertisement
E-Paper

রাজ্যসভার প্রার্থীদের মনোনয়নে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে শহুরে জনতার কাছে পৌঁছোনোর প্রয়াস মমতার, নামেই স্পষ্ট ছাপ

এই মনোনয়নে সমাজের শহুরে অংশকে (যে অংশে পশ্চিমবঙ্গে স্থিতাবস্থা বিরোধিতার প্রবণতা রয়েছে। যা লোকসভা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট ছিল। সারা রাজ্যের মোট ৭৬টি পুরসভায় পিছিয়ে ছিল তৃণমূল) কাছে টানার চেষ্টা রয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৪
TMC candidates for coming Rajya Sabha Elections: Mamata Banerjee sends across messages to urban elite

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যসভা ভোটে তিনি বরাবরই চমক দেন। এ বারেও দিয়েছেন। প্রতিবারই তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগে বিভিন্ন ধরনের গুজব এবং গালগল্প ছড়াতে থাকে। কেউ সরল ভাবে বিশ্বাস করে বসেন। আবার পোড়খাওয়া কেউ কেউ অপেক্ষা করেন। দিনের শেষে দেখা যায়, কোনও ‘সম্ভাব্য’ নামই তালিকায় নেই। উল্টে মাথার টুপি উল্টে জাদুকরের খরগোশ বার করে আনার মতো অভাবনীয় সব প্রার্থীর নাম নিয়ে হাজির হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এ বারেও তার ব্যতিক্রম হল না। তবে ফারাক একটা তৈরি হল। অন্যান্য বার রাজ্যসভা ভোটে মমতা এবং তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারস্পরিক আলোচনাসাপেক্ষে এমন প্রার্থী বাছা হয়, যাঁদের মনোনয়নের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজকে বার্তা দেওয়া যাবে। যেমন সংখ্যালঘু মুসলিম বা খ্রিস্টান মুখ, যেমন মহিলা, যেমন আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি। কিন্তু এ বার তৃণমূল রাজ্যসভার ভোটের জন্য যে প্রার্থিতালিকা পেশ করেছে, তাতে শহুরে জনতার কাছে পৌঁছোনোর প্রয়াস স্পষ্ট।

লক্ষণীয়, চার প্রার্থীকেই বাছা হয়েছে সমাজের ‘উচ্চপর্যায়’ থেকে। যাতে শহুরে জনতারও দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। প্রত্যেকেই শিক্ষিত, শহুরে এবং বাংলা ছাড়াও হিন্দি এবং ইংরেজিতে কথা বলায় সাবলীল। তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এতে সমাজের শহুরে অংশকে (যে অংশে পশ্চিমবঙ্গে স্থিতাবস্থা বিরোধিতার প্রবণতা রয়েছে। যা লোকসভা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট ছিল। সারা রাজ্যের মোট ৭৬টি পুরসভায় পিছিয়ে ছিল তৃণমূল) কাছে টানার চেষ্টা রয়েছে। যা থেকে অনেকে মনে করছেন, শহুরে মধ্যবিত্তদের ভোট নিয়ে যে উদ্বেগ তৃণমূলের অন্দরে তৈরি হয়েছে, তার ছাপ এই মনোনয়নে পড়েছে।

কোয়েল মল্লিক বাংলা ছবির জগতের দাপুটে অভিনেত্রী। একই সঙ্গে সফল সংসারী। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সহবত বোধ যথেষ্ট প্রশংসিত এবং আলোচিত। তিনি টলিউডে সে অর্থে ‘শ্রমিকশ্রেণি’ নন। মডার্ন হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী কোয়েল। মল্লিক পরিবারের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক বরাবরই ঘনিষ্ঠ। কোয়েলের বাবা প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকও তৃণমূলনেত্রীর কাছের মানুষ। ফলে কেউই খুব একটা আশ্চর্য হননি, যখন অভিষেক রঞ্জিতের বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে রাজ্য সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ তুলে দিলেন। তখনও অবশ্য কেউ ভাবতে পারেননি, কয়েক মাস পরে মল্লিক পরিবারের কন্যা কোয়েল তৃণমূল তথা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হতে চলেছেন। কিন্তু অনেকে মনে করছেন, কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোর প্রক্রিয়া সে দিনই শুরু হয়েছিল।

নরেন্দ্র মোদীর অধীনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে তৃণমূলে এসে মোটামুটি ভালবাসার উপরেই থেকেছেন বাবুল সুপ্রিয়। ভোটে লড়েছেন। রাজ্যের মন্ত্রীও হয়েছেন। মমতা প্রকাশ্যেই মন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। বাবুলের সুকণ্ঠেরও দরাজ ব্যবহার করেছেন। অভিষেকেরও আস্থাভাজনই ছিলেন বাবুল। কারণ, যাঁর হাত ধরে তাঁর বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগদান, সেই ডেরেক ও’ব্রায়েন অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন’ বলেই দলের অন্দরে পরিচিতি পেয়ে থাকেন। বালিগঞ্জ উপনির্বাচনে বাবুল মনোমতো ব্যবধানে না-জেতায় তৃণমূলের অন্দরে কিছু ফিসফাস শুরু হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, তাঁকে এ বার আর বালিগঞ্জে টিকিট দেওয়া হবে না। তার বদলে আসানসোল দক্ষিণ আসনে তাঁকে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিল দল। একটিই দায়িত্ব— অগ্নিমিত্রা পালকে হারাতে হবে। বাবুল নির্বাচনের কিছু আগে থেকেই সঙ্গীতে বেশি মনোনিবেশ করার কথা বলছিলেন। অর্থাৎ, ঠারেঠোরে বোঝাচ্ছিলেন যে, তিনি ভোটে লড়তে আগ্রহী নন। আবার একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠদের বলছিলেন, দিদি এবং অভিষেক তাঁকে ছাড়বেন না। কিন্তু আসানসোল দক্ষিণে ভোট লড়তে তিনি ‘স্বচ্ছন্দ’ ছিলেন না। সে কথা তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে বলেওছেন। দেখা গেল, মমতা-অভিষেক তাঁকে ছাড়লেন না। আবার ছাড়লেনও। রাজ্য থেকে তাঁকে পাঠানো হল দিল্লিতে। যেখানে তিনি এর আগেও কাজ করেছেন লোকসভার সাংসদ হিসাবে। অনেকের মতে, বাবুলকে ধরে রাখতেই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠালেন মমতা।

রাজীব কুমারকে নবান্ন যখন রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পদে বর্ধিত মেয়াদে রাখল না, তখন সকলেই ভেবেছিলেন, রাজীবের ‘দুর্দিন’ শুরু হল। শাসকদলের ভিতরে-বাইরে কৌশলে এমন সঙ্কেতও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, রাজীব আর মুখ্যমন্ত্রী মমতার ততটা ‘আস্থাভাজন’ নেই। অভিষেকের খাতাতেও তাঁর নম্বর ভাল নয়। সেই ধারণাকে দৃঢ়তর করতে সাহায্য করেছিল প্রকাশ্য বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজীবকে তিরস্কার এবং যুবভারতীতে মেসিকাণ্ডের পরে ডিজি হিসাবে তাঁকে রাজ্য সরকারের শো কজ় করা। গত ৩১ জানুয়ারি রাজীবের বিদায় সংবর্ধনায় তৃণমূলের অন্দরে খুশি হওয়ার লোকের অভাব ছিল না। তাঁরা ভেবেছিলেন, দক্ষ আইপিএস রাজীবকে এ বার একটি নিঝুম অবসরজীবন কাটাতে হবে। তাঁরা যে কতটা ভ্রান্ত ছিলেন, তা শুক্রবার রাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রাজীব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করায় একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছিল। কারণ, ওই মামলা যতটা না মানহানির ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ‘রাজনৈতিক বার্তা’ পৌঁছে দেওয়ার। প্রথমত, অবসরপ্রাপ্ত এক আইপিএস ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করতে তখনই যাবেন, যখন তাঁর সঙ্গে কোনও না কোনও ‘শক্তি’ থাকবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করার অর্থ কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই মামলা করা। এতদ্দ্বারা বোঝানো গেল যে, রাজীব কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সিতে অবসরের পরে যোগ দিতে পারেন বলে যে রটনা হচ্ছিল, তার কোনও সারবত্তা নেই। অনেকের মতে, রাজীবকে এই ভাবেই নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে রেখে দিলেন মমতা। পাশাপাশিই, পুলিশজীবনে রাজীব যে ভাবে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে অবসরের পর তাঁর ‘রাজনৈতিক নিরাপত্তা’ও প্রয়োজন ছিল। আবার মমতার কাছেও রাজীবের ‘প্রয়োজন’ ফুরোয়নি।

মেনকা গুরুস্বামীর মনোনয়ন নিয়ে অনেকের মনে ধন্দ রয়েছে। কারণ, মমতার হয়ে যাঁরা মামলা লড়েন, সেই কপিল সিব্বল বা অভিষেক মনু সিংহবী আইনজীবী হিসাবে মেনকার তুলনায় বেশি ‘ওজনদার’। একটি অভিমত হল, মেনকার মাধ্যমে মমতা রাজধানীর উচ্চশিক্ষিত এবং শহুরে অংশের (যারা রাজধানীতে ‘খান মার্কেট গ্রুপ’ নামে পরিচিত) কাছে পৌঁছোতে চেয়েছেন। কারণ, বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’র মুখ হিসাবে অনেকেই মমতার নাম বলছেন। জাতীয় রাজনীতিতে সেই জায়গায় পৌঁছোতে গেলে রাজধানীর বিশিষ্টজনেদের মহলকে তৃণমূলনেত্রীর প্রয়োজন হবে। মেনকার মাধ্যমে তিনি তাদের কাছেও পৌঁছোতে পারবেন বলে অনেকে মনে করছেন।

Rajya Sabha TMC Candidates CM Mamata Banerjee West Bengal Politics Koel Mallick Babul Supriyo Rajiv Kumar Menaka Guruswamy
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy