লোকসভার আসনবৃদ্ধি করে মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় পাশ করাতে পারেনি নরেন্দ্র মোদী সরকার। তার পরের দিনই, শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে একযোগে দেশের বিরোধী দলগুলিকে আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তাঁর সেই ভাষণকে কটাক্ষ করেছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের কথা বলছেন। অথচ সংসদে তাদের ২৪০ জন সাংসদের মধ্যে মহিলা মাত্র ৩১ জন। অর্থাৎ, ১৩ শতাংশ। সে দিক থেকে লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই মহিলা। প্রধানমন্ত্রীকে তৃণমূলের কটাক্ষ, ‘‘আগে নিজে ধর্ম পালন করুন। পরে অন্যকে নিয়ে কথা বলবেন।’’
বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে সক্রিয় ছিল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের পেশ করা তিনটি বিলের প্রথমটি ছিল লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল (পোশাকি নাম, ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি এরই অন্তর্গত), দ্বিতীয়টি— লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) সংক্রান্ত বিল। তৃতীয়টি— কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আসনবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে)। শুক্রবার ভোটাভুটিতে প্রথম বিলটিই আটকে যায়। সেই নিয়ে শনিবার জাতির উদ্দেশে আধ ঘণ্টার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই বিরোধীদের আক্রমণ করেন। বিশেষ করে কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টির নাম করে নারী-অস্ত্রে শাণ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
মোদীর ভাষণের আগেই তৃণমূল সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে সংসদে বিজেপির মহিলা সাংসদের উপস্থিতির হার নিয়ে সরব হয়। পাশাপাশি সেই পোস্টে কংগ্রেস, তৃণমূল এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলির মহিলা সাংসদদের সঙ্গে বিজেপির তুলনা টেনেছিল। তারা দাবি করে, মহিলা সংরক্ষণই যদি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের আসল উদ্দেশ্য হত, তবে তারা ৩৩ শতাংশে থেমে থাকত না। সেটা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করত। জাতির উদ্দেশে মোদীর ভাষণের পর একই সুরে ‘বিজেপির সদিচ্ছার অভাবের’ অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল।
প্রধানমন্ত্রী কী বিষয়ে ভাষণ দেবেন, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল দেশ জুড়ে। জল্পনা-কল্পনার মধ্যে অনেকেই দাবি করেছিলেন, মোদীর ভাষণ হতে পারে ওই তিন বিল সংক্রান্ত। সেই জল্পনাই সত্যি করে ভাষণে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ না-হওয়ায় বিরোধীদের দুষেছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে ভুল বোঝাচ্ছে বিরোধীরা। মোদী বলেন, “মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তৃণমূলের কাছে। কিন্তু সেই সুযোগ তারা নষ্ট করল। একই পথে হাঁটল সমাজবাদী পার্টিও।” প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে তৃণমূল। রাজ্যের মন্ত্রী তথা মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘লোকসভায় আমাদের ২৯ জন সাংসদ, ১১ জনই মহিলা। শতাংশের হিসাবে ৩৮। আর বিজেপির ২৪০ জনের মধ্যে মাত্র ৩১ জন মহিলা সাংসদ।’’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে চন্দ্রিমার কটাক্ষ, ‘‘আপনি আচরি ধর্ম বলে একটা কথা আছে। এটা তো মহিলা সংরক্ষণ বিল ছিল না। উনি মহিলাদের বোকা ভাবছেন। সকলকেই জন্মাতে হয় মায়ের গর্ভে। মহিলাদের এত বোকা ভাবার কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন।’’ একই সুরে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে মোদীর ভাষণের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। তাঁর অভিযোগ, সংশোধনী বিল পাশ করাতে নারীদের ‘টোপ’ হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন মোদী।
আরও পড়ুন:
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বার বার কংগ্রেসের কথা উল্লেখ করেছেন। মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভায় পাশ করাতে না-পারার সঙ্গে ভ্রূণহত্যার তুলনা টানেন মোদী। তাঁর মতে, এই বিল পাশ করাতে না-দিয়ে কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে, এসপি-র মতো দলগুলি ভ্রূণহত্যা করল। মোদী বলেন, “সৎ চেষ্টার ভ্রূণহত্যা করল কংগ্রেস, ডিএমকে, তৃণমূলের মতো দলগুলি।” প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রমণের জবাবে কংগ্রেসও সংসদে বিজেপির মহিলা সাংসদের উপস্থিতির হার নিয়ে সরব হয়েছে। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, ‘‘মহিলা সংরক্ষণ বিল সম্পর্কে উনি যে ধারণা পোষণ করেন তার সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণের কোনও সম্পর্কই নেই। ওঁর দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে লোকসভা, রাজ্যসভা এবং বিভিন্ন বিধানসভায় আসন সংখ্যা বাড়াতে হবে। আসন সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ডিলিমিটেশন আইন আছে। একটা কমিটি করে ডিলিমিটেশন করা হয়। তিনি সেই সবের মধ্যে গেলেন না। ডিলিমিটেশন কী, সেই সম্পর্কে তাঁর ধারণা নেই। তাই তিনি কংগ্রেসকে দোষারোপ করছেন। মহিলা সংরক্ষণ বিলের জনকই কংগ্রেস। উনি যদি প্রমাণ করতে চান কংগ্রেস অন্যায় কাজ করেছে, তবে বাংলা তথা ভারতের মহিলারা প্রমাণ করে দেবেন, তিনি মহিলা সংরক্ষণ চান না। তাঁদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন।’’