তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত অংশের ভোট ফেরাতে সোমবার নতুন কর্মসূচির সূচনা করল তৃণমূল। নজরুল মঞ্চে সেই সূচনা কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন সারা রাজ্যের তফসিলি অংশের তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা। আগামী দু’মাস তাঁদের কী কাজ করতে হবে, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মসূচির পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘তফসিলি সংলাপ’।
কর্মসূচি বলছে, নীল-হলুদ গাড়িতে প্রচারে যাবেন নেতারা। যে ধরনের গাড়ি রাখা হবে, তার মডেলও সোমবার হাজির করা হয়েছিল নজরুল মঞ্চের বাইরে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে থাকবেন এক জন করে ‘গ্রাউন্ড রিসোর্স ম্যানেজার’ (জিআরএম)। তিনিই নেতাকে প্রচারসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করবেন। তবে প্রচার কর্মসূচিকে সুসংহত ভাবে চালাতে জিআরএম-দের সঙ্গে নেতাদের সমন্বয়ের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পরের দিন কোথায় কর্মসূচি, সে ব্যাপারে আগের দিন জিআরএম-এর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে নেতাদের। আনুষ্ঠানিক ভাবে জিআরএম-এর দায়িত্ব পালন করবেন দলের কর্মীরাই। তবে পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনাও এর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। একসঙ্গে দু’জন নেতা যাবেন একটি এলাকায়। সঙ্গে থাকবেন জিআরএম।
কেন নীল-হলুদ গাড়ি? এই প্রসঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূল কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে সূত্রে খবর, নির্দিষ্ট ভাবনা থেকেই নীল এবং হলুদ রং ব্যবহার করা হয়েছে। নীল রঙের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন সংবিধান প্রণেতা বিআর আম্বেডকর। আর হলুদ রাজবংশীদের রঙ। গোটা উত্তরবঙ্গে যে রাজবংশীরা রয়েছেন বিপুল সংখ্যায়। একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁরা নিয়ন্ত্রক।
আরও পড়ুন:
-
‘৬০ হাজার নাম বাদ দিচ্ছে ভবানীপুরে, তবু এক ভোটে হলেও জিতব’! কমিশন এবং বিজেপি-কে চ্যালেঞ্জ মমতার
-
বাংলার যুবসাথী প্রকল্পের জন্য বিশেষ হেল্পডেস্ক চালু করল নবান্ন, প্রকল্পে আবেদনকারীদের প্রশ্নের জবাব দিতেই উদ্যোগ
-
এ বার ভোটার তালিকা নিয়ে পথে নামছেন মমতা! ৬ মার্চ ধর্মতলায় অবস্থানে বসবেন মুখ্যমন্ত্রী, জানালেন অভিষেক
কর্মসূচি বলছে, প্রত্যেক নেতাকে প্রতিদিন তিনটি করে তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত এলাকায় যেতে হবে। কখন বাড়িতে গাড়ি পৌঁছোবে, কখন দিনের কর্মসূচি শেষ, সবই নেতাদের বলবেন সংশ্লিষ্ট জিআরএম। দিনের কর্মসূচি শেষ করেই পরের দিনের ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করে দিতে হবে নেতাদের। প্রচারে মূলত তিনটি বিষয় তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে। এক, কেন বিজেপি-কে ‘বাংলা-বিরোধী’ বলা হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করা। দুই, তফসিলি অংশের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কী কী প্রকল্প চালু করেছে, তাতে কত মানুষ উপকৃত হয়েছেন, তা বলা এবং তিন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে তফসিলি জাতি বা জনজাতিভুক্তদের কী অবস্থা।
পশ্চিমবঙ্গের ৮৪টি আসন তফসিলি জাতি ও জনজাতি সংরক্ষিত। এই আসনগুলি দীর্ঘদিন ধরে ছিল বামেদের দখলে। সিপিএমের নেতা হিসাবে পুলিনবিহারী বাস্কে, দেবলীনা হেমব্রম, বিলাসীবালা সহিসেরা এই অংশ থেকেই উঠে এসেছিলেন। ২০১১ সাল থেকে এই অংশের সমর্থন ঘুরে যায় তৃণমূলের দিকে। তৃণমূলের হয়ে সংসদে গিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বাসুনিয়া, প্রকাশ চিক বরাইক, প্রতিমা মণ্ডল, বাপি হালদারেরা। মন্ত্রী হয়েছেন বীরবাহা হাঁসদা। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত এলাকায় ভাল ফল করে বিজেপি। উত্তরবঙ্গ তো বটেই, পশ্চিমাঞ্চল এবং মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় ‘ধাক্কা’ খেতে হয় তৃণমূলকে। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ধরলে তফসিলি গড়ের আসনগুলির মধ্যে কোচবিহার, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া আসন পুনরুদ্ধার করেছে তৃণমূল।
তফসিলিদের সমর্থন পাওয়া এবং হারানোর ক্ষেত্রে সারা রাজ্যে অভিন্ন কোনও ছবি নেই। বরং এলাকা বিশেষে ছবি ভিন্ন। যেমন হুগলির আরামবাগ মহকুমার আসনগুলিতে বিপুল সংখ্যক তফসিলি অংশের বাস। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট, পুরশুড়া— চারটি আসনেই জিতেছিল বিজেপি। আবার এই হুগলিরই ধনেখালি, বলাগড়, পান্ডুয়ায় জয় পেয়েছিল তৃণমূল। হাওড়ায় সেই অর্থে বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারেনি। আবার উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়ার মতুয়া অধ্যুষিত আসনে গত ভোটে পদ্ম ফুটেছিল। তবে উত্তরবঙ্গের আসনগুলিতে গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের তুলনায় বিজেপি বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল।
এই ৮৪টি আসন ছাড়াও রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই তফসিলি জাতিভুক্তদের বসবাস রয়েছে। বিস্তীর্ণ অংশে রয়েছে জনজাতিদের বসবাসও। সেই এলাকাতেও আগামী দু’মাস এই প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক। নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘স্নান-খাওয়া-ঘুমের সময়টুকু বাদ দিয়ে এখন দু’মাস দলের জন্য, রাজ্যের জন্য কাজ করতে হবে।’’ এই কাজ তদারকির জন্য বিধানসভা ভিত্তিক এক জন এবং কেন্দ্রীয় দফতর থেকে এক জন দায়িত্বে থাকবেন।