প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বয়ানে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উদ্দেশে লেখা চিঠি প্রকাশ করল তৃণমূল। তাতে বাঙালি নির্যাতন, রাজ্যকে আর্থিক বঞ্চনা-সহ অন্তত পাঁচটি বড় ‘স্বীকারোক্তি’ রয়েছে। সম্পূর্ণ চিঠিটাই লেখা হয়েছে মোদী সরকারকে খোঁচা দিয়ে। তৃণমূল সমাজমাধ্যমে এই চিঠি প্রকাশ করে লিখেছে, ‘‘যে চিঠি নরেন্দ্র মোদী কোনও দিন লিখবেন না।’’
চিঠির প্রথমেই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘লোকদেখানো ভক্তি প্রদর্শনের’ অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। দাবি, একসময় মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বার বার পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে দাবি করতেন। পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ‘জয় মা কালী’ স্লোগানের মাধ্যমে লোকদেখানো ভক্তি প্রদর্শন করতে হচ্ছে তাঁদের। পশ্চিমবঙ্গকে আর্থিক বঞ্চনা প্রসঙ্গে মোদীর বয়ানে লেখা হয়েছে, ‘‘আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে রাজ্যের প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় তহবিল আটকে দিয়েছি। নিষ্ঠুর ভাবে শ্রমিকদের মজুরি, পরিবারগুলোর মাথার ছাদ, গ্রামের রাস্তা, লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিশ্রুত পানীয় জল কেড়ে নিয়েছি।’’ মনরেগা, আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক যোজনা, জল জীবন মিশনের মতো কেন্দ্রের প্রকল্পগুলির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের হেনস্থা করার অভিযোগ তুলে আসছে তৃণমূল। সে প্রসঙ্গ তুলে মোদীকে খোঁচা দিতে তাঁর বয়ানে লেখা হয়েছে, ‘‘আমি আমার দলের শাসন চলা রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের নিশানা করা শুরু করেছি। বাঙালি ও বাংলাদেশিদের মধ্যে থাকা পার্থক্যকে সচেতন ভাবে মুছে দিয়ে মাতৃভাষার ভিত্তিতে মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে তাঁদের আটক, দেশান্তর, শারীরিক নির্যাতন করেছি। এমনকি মৃত্যুর পথেও ঠেলে দিয়েছি।’’ রাজ্য সরকারের ‘স্বনির্ভর বাংলা’কে মোদী হিংসা করেন বলেও দাবি করেছে তৃণমূল। অভিযোগ, মহিলাদের সঙ্গে মোদী বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং কৃষকদের ভবিষ্যৎ বিদেশি শক্তির কাছে বন্ধক দিয়েছেন।
কিছু দিন আগে মোদী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। চিঠিতেও সেই কটাক্ষ রয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘‘আমি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অত্যন্ত হালকা ভাবে বঙ্কিমদা বলে সম্বোধন করার মতো ভুল করেছি। আমার দল স্বামী বিবেকানন্দকে ‘অজ্ঞ বামপন্থী প্রডাক্ট’ বলে অপমান করেছে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর করেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গায়ের রঙ নিয়ে উপহাস করেছে এবং ‘জনগণমন’কে ব্রিটিশদের স্বাগন জানানোর গান বলে বিদ্রুপ করেছে।’’ স্বাধীনতা দিবসে নেতাজির ট্যাবলো বাতিল, সারদাদেবীর ব্যঙ্গচিত্র ছড়ানো এবং মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের চিঠিতে।
অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্য’ বলে প্রচার করে বিজেপি। বাঙালিদের দেগে দেওয়া হয় ‘ঘুসপেটিয়া’ বলে। দাবি, পহেলগাঁও হামলা ও দিল্লির লালকেল্লার সামনের বিস্ফোরণে কেন্দ্রের ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই এসব করা হয়েছে। মোদীর বয়ানের চিঠিতে এসেছে এসআইআর প্রসঙ্গ। লেখা হয়েছে, ‘‘আমি নির্বাচন কমিশনকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলাম। বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিতে, ভোটের ফলাফল আমাদের পক্ষে আনতে পশ্চিমবঙ্গের উপর চাপিয়ে দিলাম এসআইআর। ইতিমধ্যে তাতে ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমি তার দায়ভার গ্রহণ করিনি।’’ বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যবাসীর ‘বেঁচে থাকা তাদের উপর নির্ভর করবে’ বলে দাবি করেছে তৃণমূল। বলা হয়েছে, মাছ ও মাংস খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে। বিজেপির ‘পাল্টানো দরকার’ প্রচারে সেই আভাসই রয়েছে। ইংরেজি এবং বাংলা, দুই ভাষাতেই এই চিঠি প্রকাশ করেছে তৃণমূল।