তৃণমূল তৈরি হওয়ার পরে তৎকালীন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক অধুনা প্রয়াত অনিল বিশ্বাস প্রায়ই বলতেন, এই দলটার না-আছে মতাদর্শ, না-আছে গঠনতন্ত্র, না-আছে কর্মসূচি। তৃণমূলের মতাদর্শ কী, এ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কখনও তেমন সুস্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে অনিল বিশ্বাসের দল সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া তরুণ নেতা প্রতীক-উর রহমানকে পাশে নিয়ে কথা বলার সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে উঠে এল তাঁদের দলীয় মতাদর্শের প্রসঙ্গ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় নিজের সাংসদ কার্যালয়ের বাইরে শনিবার অভিষেক বলেন, ‘‘অনেকে বিদ্রুপ করে বলেন, তৃণমূলের মতাদর্শ কী? আমি বলছি, তৃণমূলের মতাদর্শ ওয়েলফেয়ারিজ়ম (মানুষকে সমাজিক সুরক্ষা দেওয়া)।’’ ঘটনাচক্রে সিপিএম যখন তাদের সমাজবদলের বিপ্লবী কর্মসূচির মধ্যেই রাজ্যে রাজ্যে সরকার গঠনের লাইন নিয়েছিল, তখনও সাধারণ মানুষকে রিলিফ বা স্বস্তি দেওয়ার কথাই বলেছিল। অভিষেকের বক্তব্য, শুধু সরকারি পরিষেবাই নয়, তাঁরা সাংগঠনিক ভাবেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাজ করেন। তৃণমূলের সেনাপতি বলেন, ‘‘কারও বাড়িতে যদি আগুন লাগে, তা হলে যিনি প্রথম দমকলে খবর দেবেন, তিনি হলেন পা়ড়ার তৃণমূল কর্মী। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হলে, ডাকবেন তৃণমূলেরই পঞ্চায়েতের কেউ। এটাই তৃণমূলের মতাদর্শ।’’
তৃণমূলের মতাদর্শ নিয়ে বামেরা প্রায়ই খোঁচা দেয়। কটাক্ষ করে বলে, টিএমসির পুরো কথা তোলামূল কংগ্রেস। বাম শিবির ছেড়ে আসা প্রতীক-উরকে পাশে নিয়ে বামেদের দিকেই মতাদর্শ নিয়ে দ্বিচারিতার পাল্টা অভিযোগ করেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘কী তাঁদের মতাদর্শ যে, যখন কেরলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ছে তখন পশ্চিমবঙ্গে সেই কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়েই লড়ছে? কী তাদের মতাদর্শ যে আব্বাস সিদ্দিকি, হুমায়ুন কবীরদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গোপন বৈঠক করতে হয়?’’
আরও পড়ুন:
-
লোকসভা ভোটে লড়েছিলেন যাঁর বিরুদ্ধে, সেই অভিষেকের হাত ধরে তৃণমূলে প্রতীক-উর! দ্রুত বহিষ্কার করল সিপিএম
-
‘সিপিএম আমায় তিন তালাক দিয়েছে, যারা করেছে, তাদের রাতের ঘুম হারাম করে দেব!’ একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতীক-উর
-
দীপ্সিতাও কি অনিল বিশ্বাসের কন্যা অজন্তার পথে? এখনও সিপিএমের সদস্যপদ নবীকরণ করাননি, প্রতীক-পর্বে জল্পনা
তৃণমূলের অনেক প্রবীণ নেতা একান্ত আলোচনায় প্রায়ই বলেন, দলের জন্মের সময়ে মূল মতাদর্শ ছিল সিপিএমের বিরোধিতা। সেটাই ছিল মমতার পুঁজি। সেই আদর্শ নিয়ে তৃণমূল উদ্দেশ্যসাধন করেছে। সরকার থেকে চলে গিয়েছে সিপিএম। তৃণমূল এখন ক্ষমতায়। আর তৃণমূল যখন ১৫ বছর ক্ষমতায়, তখন সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রান্তিক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। এখন তৃণমূলের কাছে হাতিয়ার সরকারি প্রকল্পই। সর্বশেষ বাজেটেও নতুন প্রকল্প দিয়ে, পুরনো প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সমাজের বৃহত্তর অংশকে ছুঁতে চেয়েছেন মমতা। অভিষেক সেটাকেই মতাদর্শের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন।
বাম রাজনীতিতে ‘মতাদর্শ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার ভিত্তিতে বাম রাজনীতিতে সারা দুনিয়া জুড়ে যুগে যুগে বহু বিভাজনও ঘটে গিয়েছে। ভারতেও সিপিআই ভেঙে সিপিএম তৈরি হওয়ার নেপথ্যে ছিল মতাদর্শগত সংগ্রাম। বিজেপির ক্ষেত্রেও ‘মতাদর্শ’ মুখ্য বিষয়। দু’টি বিপরীত মতাদর্শের দল হলেও, গত তিনটি বড় নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, একদা যে ভোট ছিল বামেদের দিকে, সেই ভোট বিজেপির বাক্সে পুঞ্জীভূত হয়েছে। অভিষেক তা নিয়েও সিপিএম-কে কটাক্ষ করেছেন শনিবার।
সিপিএম-কে কটাক্ষ করার পরে তৃণমূলের মতাদর্শ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রয়াত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী এবং নোবেলজীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের প্রসঙ্গও টানেন অভিষেক। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ বলেন, ‘‘মহাশ্বেতা দেবী উলুবেড়িয়ার একটি সভা থেকে বলেছিলেন, মমতার যত বয়স বাড়ছে, তত এনার্জি বাড়ছে। অমর্ত্য সেন বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। তাঁদের মতাদর্শ কী?’’