Advertisement
E-Paper

১৬ ডিএম-এসপি-সহ কয়েক ডজন কর্তার বিরুদ্ধে কমিশনে যাচ্ছে বিজেপি

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৮ ১৯:০৪
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

শুধু তৃণমূলকে নয়, রাজ্যের হাফ ডজনেরও বেশি জেলাশাসক এবং প্রায় সমসংখ্যক পুলিশ সুপারকে জোরদার ধাক্কা দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করছে বিজেপি। তৃণমূল শুধু দলীয় নেতাদের কথায় চলছে না, চলছে পুলিশ-প্রশাসনের বেশ কয়েক জন উচ্চপদস্থ কর্তার সক্রিয় অংশগ্রহণে— বলছে রাজ্য বিজেপি। কোন কোন সরকারি কর্তা ‘তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন’, তার তালিকা তৈরিও শুরু হয়ে গিয়েছে বলে ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেন সূত্রের খবর। আগামী ডিসেম্বরেই নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়ে ওই সরকারি কর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জানানো হবে বলে বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তো বটেই, তৃণমূলের অন্য নেতারাও যে কোনও জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বিজেপি-কে আজকাল মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’। ২০১১-র পর থেকে একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের পারফরম্যান্স যে সত্যিই দুর্জয়, তা অস্বীকার করার উপায়ও অবশ্য নেই। কিন্তু রাজ্য বিজেপির নেতারা এ বার বলতে শুরু করেছেন যে, বিজেপি নির্বাচন করাতে জানে না, এমনটা ভাবলেও খুব ভুল হবে। নিজেদের নির্বাচনী দক্ষতার পরিচয় দিতে দেশের নানা প্রান্তে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে আসা ‘ইলেকশন ম্যানেজার’দের একে একে বাংলার মাটিতে হাজির করতেও শুরু করেছে বিজেপি। কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং অরবিন্দ মেনন সেই তালিকায় অন্যতম উল্লেখযোগ্য দু’টি নাম।

রাজ্য বিজেপি-তে অবশ্য আরও এক ‘ইলেকশন ম্যানেজার’-এর নাম নিয়ে চর্চা বাড়তে শুরু করেছে। তিনি এক কালে তৃণমূলেরই নির্বাচনী কন্ট্রোল রুম সামলাতেন। এখন বিজেপি-তে ঢুকেছেন। অমিত শাহ ইতিমধ্যেই তাঁকে রাজ্য বিজেপির ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক পদে বসিয়ে দিয়েছেন। তার পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের ‘সাফল্যের ফর্মুলা’ তছনছ করার তোড়জোড়। পুলিশ-প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের নামের তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার ভাবনা সেই তোড়জোড়েরই অঙ্গ।

পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠন ঘিরে নদিয়ার ভীমপুরে বোমাবাজি। বিজেপির দাবি, প্রশাসনের মদতেই তৃণমূল কর্মীরা বোমাবাজি করে। —ফাইল ছবি

কোন কোন জেলার জেলাশাসকের নাম বিজেপির ‘কালো তালিকা’য় ঢুকছে? কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, বীরভূম, পুরুলিয়া, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা— মূলত এই জেলাগুলির জেলাশাসকদের বিরুদ্ধেই বিজেপির রোষ এখন সবচেয়ে তীব্র।

আরও পড়ুন: ছত্তীসগঢ়ে প্রচার: ‘শহুরে মাওবাদী’ তোপ মোদীর, নোটবন্দি-পিএনবি-তে পাল্টা রাহুলের

কোন কোন পুলিশ সুপারের নাম থাকতে পারে বিজেপির ‘কালো তালিকা’য়? কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, বীরভূম, পুরুলিয়া— মূলত এই জেলাগুলির পুলিশ সুপারদের বিরুদ্ধে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে অভিযোগ জানানো হবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। তবে পুলিশের ক্ষেত্রে বিজেপির অভিযোগের ঝাঁপিতে আরও নীচের দিককার আধিকারিকদের নামও রয়েছে। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার এসডিপিও-র বিরুদ্ধে রীতিমতো ক্ষোভের আগুন জ্বলছে বিজেপিতে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর কথায়, ‘‘ওই এসডিপিও তো পুলিশ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন না। উনি কাজ করছেন তৃণমূল নেতা হিসেবে। এলাকায় কী ভাবে তৃণমূল চলবে, কোন নেতা কোন দায়িত্ব পাবেন, কে টিকিট পাবেন, কে পাবেন না— সব সিদ্ধান্ত উনিই নেন।’’ সায়ন্তনের আরও অভিযোগ, ‘‘বাম আমলে হুগলি জেলার গোঘাট থানার ওসি ছিলেন ওই অফিসার। সে সময়ে সিপিএমের হয়ে সন্ত্রাস কায়েম করেছিলেন এলাকায়। এখন তৃণমূলের হয়ে বিষ্ণুপুরে একই কাজ করছেন। বিজেপির নেতা, কর্মী বা সমর্থকদের একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছেন।’’ বসিরহাট পুলিশ জেলা, বারাসত পুলিশ জেলা, ব্যারাকপুর কমিশনারেট এবং আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের বেশ কয়েক জন পদস্থ কর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানানো হতে পারে বলে খবর।

বিজেপি যে তালিকা নির্বাচন কমিশনের হাতে তুলে দেবে, তাতে বিভিন্ন থানার আইসি বা ওসি-দের নামও থাকবে বলে জানা গিয়েছে। বিজেপির চোখে ‘ভিলেন’ হয়ে ওঠা আইসি বা ওসি-র সংখ্যা পুরুলিয়াতেই সবচেয়ে বেশি। রঘুনাথপুর, কাশীপুর, সাঁতুড়ি, পারা এবং জয়পুরের আইসি বা ওসি-দের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হবে বলে শোনা যাচ্ছে। বীরভূমেও এই সংখ্যাটা কম নয়। দুবরাজপুর, নানুর, সদাইপুরের আইসি বা ওসিরা বিজেপির ‘কালো তালিকা’য় ঠাঁই পেয়ে গিয়েছেন বলে খবর। এ ছাড়া কোচবিহারে ৪ জন, মালদহে ৩ জন এবং ঝাড়গ্রাম জেলায় ১ জন আইসি বা ওসি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হবে বলে খবর। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইঙ্গিত, কোচবিহারের যে সব আইসি বা ওসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হবে, তাঁদের মধ্যে সিতাই এবং দিনহাটার আইসি বা ওসির নাম থাকতে পারে।

আরও পডু়ন: তিন হাজার কোটির ‘শত্রুর সম্পত্তি’ বিক্রি করবে সরকার

বিজেপি নেতাদের দাবি, পুলিশ ও প্রশাসনের এই কর্তারা খুব স্পষ্ট ভাবেই তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন। নিজেদের পদের তথা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সরকারি কর্তারা তৃণমূলকে সাহায্য করেছেন বলে বিজেপি নেতাদের দাবি। বিজেপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অজস্র মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও তাঁদের অভিযোগ। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে প্রশাসন ও পুলিশের এই কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। এই আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে কিছুতেই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়— বিজেপির তরফে এমনই অভিযোগ জানানো হবে। লোকসভা নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়া মাত্রই পুলিশ-প্রশাসন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন কমিশন যাতে ওই আধিকারিকদের সরিয়ে দিয়ে ভোটের পথে এগোয়, বিজেপির তরফে তেমন দাবিই জানানো হবে।

বলরামপুরের জাভা গ্রামে বিজেপি কর্মী দুলাল কুমারের মৃতদেহ উদ্ধার। বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ-প্রশাসন তদন্তে পক্ষপাতিত্ব করেছে। —ফাইল ছবি

রাজ্য বিজেপির সদর দফতরে কান পাতলে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ টের পাওয়া যাচ্ছে দক্ষিণ দিনাজপুরের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় আর পুরুলিয়ার জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায়ের বিরুদ্ধে। পুরুলিয়ায় অমিত শাহের সভার দিনে অলকেশবাবুর সঙ্গে তুমুল বচসা হয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র। বিজেপির কারও কারও দাবি, বাবুলের সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল ওই জেলাশাসকের। তবে বিজেপির এই অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ মেলেনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে জেলাশাসকের বচসার যে সব ভিডিয়ো ক্লিপ ছড়িয়েছিল, তাতেও হাতাহাতির কোনও ছবি দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে ঢোকা এক নেতার বিরুদ্ধে বলরামপুর থানায় অভিযোগ করেছেন জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায়। অসম্মানজনক এবং অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। তাই অলকেশবাবুর নাম আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বিজেপির ‘কালো তালিকা’য়। বিজেপির ওই নেতা পুরুলিয়ার পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধেও কিছু মন্তব্য করেছিলেন বলরামপুরের জনসভায়। তাই পুলিশ সুপারও ওই নেতার বিরুদ্ধে আলাদা করে অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ সুপার আকাশ মাঘারিয়ার এই পদক্ষেপের পরেই তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানানোর কথা বিজেপি ভাবতে শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনার আগে পর্যন্ত মাঘারিয়ার উপরে বিজেপি খুব একটা রুষ্ট ছিল না বলেই খবর।

বিজেপি যে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারে, সে কথা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল পুরুলিয়ার জেলাশাসকের কাছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ও কোনও মন্তব্য করতে চাননি এই বিষয়ে।

বাংলার রাজনীতি, বাংলার শিক্ষা, বাংলার অর্থনীতি, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার স্বাস্থ্য, বাংলার আবহাওয়া - পশ্চিমবঙ্গের সব টাটকা খবর আমাদের রাজ্য বিভাগে।

BJP District Magistrate Police Super Complain Election Commission
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy