Advertisement
E-Paper

তাপস উদ্ধারে রাজ্য যাবে ডিভিশন বেঞ্চে

তাপস পাল-মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দু’টি আবেদন দায়ের হতে চলেছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে। একটি তাপস পালের নিজের তরফে। অন্যটি দাখিল করবে রাজ্য সরকার। গত ১৪ জুন নদিয়ায় পাঁচটি জায়গায় সভা করতে গিয়ে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ তাপস পাল যে সব উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানায় একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩০ জুলাই ২০১৪ ০২:৩৬

তাপস পাল-মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দু’টি আবেদন দায়ের হতে চলেছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে। একটি তাপস পালের নিজের তরফে। অন্যটি দাখিল করবে রাজ্য সরকার।

গত ১৪ জুন নদিয়ায় পাঁচটি জায়গায় সভা করতে গিয়ে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ তাপস পাল যে সব উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানায় একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল। অভিযোগটিকে এফআইআরের মর্যাদা দেওয়ার জন্য নাকাশিপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জকে সোমবার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি দত্ত। নির্দেশ কার্যকর করার সময়সীমাও তিনি বেঁধে দিয়েছেন বাহাত্তর ঘণ্টা। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, ওই এফআইআরের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত করবে, হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে।

এবং এর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, মঙ্গলবার রাজ্যের আইনমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিচারপতি দত্তের নির্দেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করবে। সরকারি সিদ্ধান্তটির পিছনে কোন যুক্তি কাজ করছে, তার কোনও ব্যাখ্যা আইনমন্ত্রী দেননি।

রাজ্য সরকার কোন যুক্তিকে হাতিয়ার করতে পারে, হাইকোর্ট-সূত্রে অবশ্য তার কিছু আভাস মিলেছে। সূত্রের বক্তব্য: বিচারপতি দত্তের এজলাসে রাজ্যের তরফে দাবি করা হয়েছিল, তাপসবাবুর মন্তব্যের জেরে কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অতএব তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরেরও যুক্তি নেই বলে রাজ্য সওয়াল করেছিল। এখন ওই একই যুক্তি দেখিয়ে রাজ্য সরকার ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হতে চলেছে বলে সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

হাইকোর্টের আর একটি সূত্রের ব্যাখ্যা: তাপস-মামলায় বিচারপতি দত্ত তাঁর ৪৩ পাতার নির্দেশনামাটির ছত্রে ছত্রে রাজ্য সরকারের পুলিশ-প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। মামলার আবেদনকারীও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনেছেন। পুরো ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রতিফলিত হয়েছে আদালতের পর্যবেক্ষণেও। অন্য দিকে রাজ্য মনে করছে, বিচারপতির এই জাতীয় মন্তব্যের দরুণ মানুষের কাছে রাজ্য প্রশাসন সম্পর্কে ভুল ধারণা হবে। এই যুক্তি দেখিয়েও হাইকোর্টের নির্দেশে সরকার স্থগিতাদেশ চাইতে পারে বলে সূত্রটির অনুমান।

প্রসঙ্গত বিচারপতি দত্ত তাঁর নির্দেশে বিচারব্যবস্থার উপরে আমজনতার আস্থা অটুট রাখার উপরে জোর দিয়েছেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, যে কোনও একটি জায়গায় অবিচার হওয়ার অর্থ সর্বত্র ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হওয়া। এমতাবস্থায় তাপস পাল কোন যুক্তিতে ডিভিশন বেঞ্চে যাচ্ছেন? তাঁর কৌঁসুলি তো এজলাসেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সাংসদের এমন সব উক্তি করা ঠিক হয়নি!

এ দিন তাপসবাবুর কৌঁসুলি রাজদীপ মজুমদারের ব্যাখ্যা, “বিচারপতি দত্ত তাঁর নির্দেশের এক জায়গায় বলেছেন, তাপস পাল প্রকাশ্যে ক্ষমা চাননি! অথচ আমরা হলফনামায় জানিয়েছিলাম, সাধারণ মানুষ, সংবাদ মাধ্যম ও দল সকলের কাছেই সাংসদ ক্ষমা চেয়েছেন। ডিভিশন বেঞ্চে আমরা এই অসঙ্গতিটি তুলে ধরব।”

ঠিক একই ভাবে গত ১১ এপ্রিল পাড়ুই মামলায় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত যখন ডিজি-কে তলব করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে গিয়ে মুখরক্ষা করেছিল রাজ্য। পাড়ুই মামলা তার পর কিছু দিনের জন্য বিচারপতি দত্তের এজলাস থেকে সরে যায়। পরে আবার মামলাটি পুরনো এজলাসে ফিরেছিল। তার পরে বিচারপতি দত্ত নিজেই ওই মামলা থেকে অব্যাহতি নেন। পাড়ুই-সহ একাধিক মামলাতেই তিনি পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন। তাপস-মামলাও তার ব্যতিক্রম নয়।

বিচারপতি দত্তের নির্দেশ মোতাবেক নাকাশিপাড়া থানায় এফআইআর দাখিলের সময়সীমা উত্তীর্ণ হচ্ছে আগামী কাল, বৃহস্পতিবার। যদিও এ দিন রাত পর্যন্ত থানার তরফে এফআইআর রুজুর কোনও উদ্যোগ নেই। প্রশ্ন করা হলে নদিয়ার পুলিশ সুপার অর্ণব ঘোষের জবাব, “কোর্টের নির্দেশের প্রতিলিপি এখনও আমরা হাতে পাইনি। পেলে নির্দেশ অনুযায়ী কাজ হবে।”


সবিস্তার দেখতে ক্লিক করুন

ঘটনা হল, আদালতের নির্দেশ পালন করা হবে ধরে নিলে তা ঠেকাতে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করতে হবে ৭২ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই অর্থাৎ আজ, বুধবার কিংবা কাল, বৃহস্পতিবারের মধ্যে। তাপস পালের কৌঁসুলি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আজ কিংবা আগামী কাল ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করবেন। আবার রাজ্য সরকারের তরফে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আজ বুধবার হাইকোর্টের নির্দেশ হাতে পেলে তাঁরা ঠিক করবেন, কবে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করা হবে। তাপস-মামলায় সরকার পক্ষের হয়ে বিচারপতি দত্তের এজলাসে সওয়াল করেছিলেন যিনি, সেই গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন বিকেলে বলেছেন, রাজ্য সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে আবেদনের বিষয়ে এখনও সরকারি ভাবে তাঁকে কেউ কিছু জানায়নি।

হাইকোর্টের এক সূত্রের খবর: তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্যের হয়ে সওয়াল করতে পারেন। যদিও কল্যাণবাবু জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে সরকারের তরফে এ দিন সন্ধে পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।

তবে রাজ্য সরকারের তরফে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদনের যৌক্তিকতা ঘিরে ইতিমধ্যে কিছু মহলে প্রশ্ন উঠেছে। “তাপস পালের বিরুদ্ধে এফআইআর রুজুর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি দত্ত। তাঁর নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যেতে হলে তাপস পাল যাবেন। রাজ্য সরকার যাবে কেন?” জানতে চাইছেন হাইকোর্টের আইনজীবী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তাঁর আরও প্রশ্ন, “তা হলে কি রাজ্য সরকার মেনে নিচ্ছে যে, তাপস পাল ওই বক্তব্য পেশ করে ঠিক করেছেন?” সুব্রতবাবু জানাচ্ছেন, “হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে তাপসবাবুর কৌঁসুলি নিজেই কবুল করেছেন যে, তাঁর মক্কেল ওই সব কথা বলে ঠিক করেননি। এখন দেখি, রাজ্য সরকার ডিভিশন বেঞ্চে কী বলে!” সিপিএম নেতা শ্যামল চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া, “আইনের চোখে যিনি অপরাধী, তাঁকে রক্ষা করতে রাজ্য সরকারই উদ্যোগী হয়েছে!”

বস্তুত বিচারপতি দত্তের নির্দেশনামায় ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের প্রতি পুলিশ-প্রশাসনের নির্লিপ্তির ‘সামাজিক ব্যাধি’কে যেমন নির্দিষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্য সরকারের পক্ষে তাকে চ্যালেঞ্জ করা দস্তুরমতো কঠিন হবে বলেই হাইকোর্টের আইনজীবীদের একাংশের ধারণা। ওঁদের মতে, এই মামলার প্রসঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গের পরিধি ছাড়িয়ে সারা দেশের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত করে বিচারপতি দত্ত অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ করেছেন। বিশেষত সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে তিনি যে ভাবে নিজের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন, ডিভিশন বেঞ্চের পক্ষে তা খণ্ডন করা বেশ কঠিন হতে পারে।

“এই পরিস্থিতিতে ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্য সরকার কী ভাবে সওয়াল করে, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।” মন্তব্য এক আইনজীবীর।

tapas pal hate speech division bench highcourt
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy