বিধানসভা নির্বাচনের পরে সবে বিএলওরা স্কুলে ফিরেছেন। গরমের ছুটির পরে স্কুলও খুলেছে সোমবার থেকে। কিন্তু অন্যতর গুরুদায়িত্বের ভার তাঁদের অনেককেই ফের স্কুলের ক্লাসঘর থেকে সরিয়ে নিতে চলেছে।
এ বার নতুন বিজেপি সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনার কাজের ভার চাপছে প্রধানত বিএলও-দের উপরে। অভিযোগ, এতে ফের স্কুলে শিক্ষকের অভাব শুরু হচ্ছে। পালাবদলের পরেও নানা সরকারি কাজে স্কুলের ক্লাস থেকে শিক্ষক সরানোর রীতি অটুট। কয়েকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, এক-একটি স্কুল থেকে ৭-৮ জন শিক্ষককে ফের অন্নপূর্ণা যোজনার কাজে যেতে হচ্ছে। কোনও স্কুলে একাদশ-দ্বাদশে কোনও একটি বিষয়ে মাত্র এক জন শিক্ষক থাকলেও তাঁর রেহাই নেই। তিনিও সরকারি দায়িত্ব সামলাতে বাধ্য হচ্ছেন। এই কাজ থেকে রেহাই চেয়ে আর্জি জানিয়েও লাভ হয়নি বলে দাবি শিক্ষকদের একাংশের। তাঁদের প্রশ্ন, একটার পর একটা যোজনা আসবে সরকারের। স্কুলে পড়ানো বন্ধ করে তবে কি যোজনার কাজই করে যেতে হবে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের?
ভোটের আগে বিএলও-র কাজের চাপে গত নভেম্বর থেকে কার্যত স্কুলেই যেতে পারেননি বহু শিক্ষক। বিরাটির একটি স্কুলের এক শিক্ষিকা বলেন, “আমি একাদশ-দ্বাদশে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও কম্পিউটার সায়েন্স পড়াই। আমার স্কুলের আমিই একমাত্র কম্পিউটারের শিক্ষিকা। গত ছ’মাস স্কুলে গিয়ে এক লাইনও পড়াতে পারিনি। একাদশ থেকে দ্বাদশে যারা উঠল এবং দ্বাদশে যারা উচ্চ মাধ্যমিকের চতুর্থ সিমেস্টার দিল, তাদের কোনও ক্লাসই নিতে পারিনি বিধানসভা ভোটে বিএলও-র কাজের জন্য। এখন অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম ভরার কাজে যেতে হলে আবারও ক্লাসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না।” তাঁর কথায়, “আমি স্কুলের একমাত্র কম্পিউটারের শিক্ষক। এই বিষয়টা প্র্যাক্টিক্যাল নির্ভর। প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস করাতে না-পারলে তো পড়ুয়ারা কিছুই শিখবে না।” বিরাটির ওই শিক্ষিকা জানান, তাঁদের জেলা প্রশাসন থেকে এই কাজের জন্য ফর্ম নিতে বলা হয়েছে। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এই কাজ করবেন না। সে জন্য তাঁরা ডেপুটেশনও দিয়েছেন।
শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী শিক্ষকদের শিক্ষার বাইরে তিনটি কাজে নিযুক্ত করা যায়। জনগণনার কাজ, নির্বাচনের কাজ এবং কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ত্রাণের কাজ। এ ছাড়া অন্য কোনও কাজে শিক্ষকদের নিযুক্ত করা যায় না। তাঁদের প্রশ্ন, তা হলে কোন যুক্তিতে এই সব যোজনার কাজে তাঁদের টানা হচ্ছে? সরকারি স্কুলে যারা পড়ে তারা অনেকেই আর্থিক ভাবে দুর্বল এবং স্কুলে ক্লাসের উপরে নির্ভরশীল। তারা কী ভাবে পড়া শেষ করবে? সামনে শুধু উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় সিমেস্টার বা তৃতীয় সিমেস্টারই নয়, রয়েছে বিভিন্ন ক্লাসের পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার পড়ানোই বা কী করে হবে? শিক্ষকদের অভিযোগ, তাঁরা জানতে পেরেছেন, অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণ যাঁরা করবেন তাঁদের ওই ফর্ম দেখে যাচাই করতে হবে ওই মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য টাকা পাওয়ার যোগ্য কি না। তাঁদের প্রশ্ন, এই যাচাইয়ের কাজ কী ভাবে শিক্ষকদের পক্ষে সম্ভব?
টাকি গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শম্পা চক্রবর্তী জানান, তাঁদের স্কুল থেকে বিধানসভা ভোটের জন্য বিএলও হিসেবে ১১ জনকে নেওয়া হয়েছিল। এখন অন্নপূর্ণা যোজনার কাজে সাত শিক্ষক ও এক শিক্ষাকর্মীকে যেতে বলা হয়েছে। না গেলে শো-কজ় করা হবে। বাঙুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, “আমাদের স্কুল থেকে তিন জন শিক্ষককে এই কাজে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা সবে বিএলও-র কাজ সেরে ফিরেছেন।” যদিও শিক্ষা দফতর সূত্রে খবর, পড়াশোনা যাতে কোনও ভাবে ব্যহত না হয় সে জন্য স্কুলের ক্লাসের পরেই শিক্ষকদের এ কাজ করতে বলা হয়েছে। তবে ভোটার তালিকার কাজ সেরে এত দায়িত্বপালন বাস্তবসম্মত নয় বলে অধিকাংশ শিক্ষকের মত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)