খুনে হাতিদের খোঁয়াড়ে পুরতে চেয়ে দিল্লিতে ফের তদ্বির শুরু করল রাজ্য সরকার।
উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গল দাপিয়ে বেড়ানো হস্তিকুলের অনেকের মতিগতি বিশেষ ভাল ঠেকছে না জানিয়ে, বছর তিনেক আগেই কেন্দ্রীয় বন মন্ত্রকের দ্বারস্থ হয়েছিল বন দফতর। সে বার ছাড়পত্র মেলেনি।
ক্ষমতায় ফিরে, ফের সেই আবদার নিয়েই দিল্লিতে দরবার করেছে রাজ্য।
বন দফতরের চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন প্রদীপ ব্যাস বলেন, ‘‘উত্তর ও দক্ষিণ— বাংলার দু’প্রান্তে হাতিরা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ১৮টি হাতিকে তাই বন্দি করার কথা ভাবা হচ্ছে।’’
ইতিমধ্যেই, চিলাপাতা, বক্সা, গরুমারা বা চাপড়ামারি-সহ উত্তরবের বনাঞ্চলে বেশ কয়েকটি হাতিকে তাদের স্বভাব-চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলেও মিলেছে এমনই কয়েকটি ‘দুষ্টু’ হাতির সন্ধান। খোঁয়াড়ে পুরে তাদের ‘সংশোধন’ই এখন পাখির চোখ বন দফতরের।
রাজ্যের বনসচিব চন্দন সিংহ বলছেন, ‘‘হাতির উপদ্রব নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী উদ্বিগ্ন। সরকার চাইছে— হাতিও বাঁচুক, নিরুপদ্রবে বাঁচুক গ্রামের মানুষও।’’ তিনি জানাচ্ছেন, হাতির হানায় এক বছরে অন্তত ১০৮ জন মারা গিয়েছেন। হাতিদের ‘স্বভাব সংশোধন’ তাই জরুরি হয়ে উঠেছে। খোঁয়াড়ে পোরার তদ্বির সে কানেই।
কিন্তু এ ছাড়া কি উপায় ছিল না?
প্রদীপবাবু বলছেন, ‘‘হাতি মেরে ফেলার পক্ষপাতী নই আমরা। বরং তাদের ধরে, প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়, সে কথাই ভাবা হচ্ছে।’’ ঝাড়গ্রাম এবং বক্সার জঙ্গলে তাই পরিখা কেটে, শাল খুঁটির বেড়া তুলে দু’টি ‘হস্তি-সংশোধনাগার’ তৈরিতেও হাত দিয়েছে বন দফতর।
তবে, বনের হাতিকে এ ভাবে বন্দি করার ব্যাপারে ঘোর আপত্তি দেশের হস্তি-প্রেমী সংগঠনগুলির। তাদের প্রশ্ন, হাতিকে আবার এ ভাবে সংশোধন করা যায় নাকি?
হাতি সংরক্ষণে দেশের সর্বোচ্চ সংস্থা বন মন্ত্রকের প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট কর্তৃপক্ষও সবুজ সঙ্কেত দেয়নি। প্রোজেক্ট কর্তা আর কে শ্রীবাস্তব বলছেন, ‘‘প্রস্তাব এসেছে ঠিকই, তবে সব দিক খতিয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’’
২০১৫-১৬ সালে, হাতির হানায় রাঢ়বঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া পুরুলিয়া এবং বর্ধমানে মারা গিয়েছেন ৭১ জন, উত্তরবঙ্গে সংখ্যাটা ৩৭। সঙ্গে রয়েছে ফসলহানি, গ্রামে ঢুকে ঘর-বাড়ি ভাঙার অগুন্তি নজির। বনের হাতিদের বারবার এ ভাবে লোকালয়মুখো হওয়ার কারণ অবশ্য হাতিদের স্বভাব পরিবর্তন নয়। পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি পাল্টা প্রশ্ন তুলছে— ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া বনাঞ্চলে হাতিরা থাকবে কোথায়? লোকালয়ে তাদের আনাগোনা বাড়ছে তো সে কারণেই।
বন কর্তারা স্বীকার করছেন, গত কয়েক বছরে রাজ্যে হাতির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বনাঞ্চলের প্রসার ঘটেনি। এক কর্তা বলছেন, ‘‘বাড়া তো দূরের কথা, বরং উত্তরবঙ্গে হ্রাস পেয়েছে বনাঞ্চল।’’ দক্ষিণবঙ্গে বাঁকুড়া বা পশ্চিম মেদিনীপুরে জঙ্গলের কিঞ্চিৎ বাড়-বৃদ্ধি ঘটলেও, প্রতি বছর সেখানে ঝাড়খণ্ডের দলমার জঙ্গল থেকে এসে থানা গেড়ে বসছে শ’দুয়েক হাতি। বছরের একটা বড় সময় ওই বনাঞ্চলেই তাদের ঠিকানা। কিন্তু সে জঙ্গলে অতগুলো হাতির খাবারের জোগান কোথায়? খাবারের খোঁজে হস্তিকুল তাই পা বাড়াচ্ছে গ্রাম আর আবাদি জমিতে।
রাজ্যের বনকর্তাদের একাংশ চাইছেন, ওই পরিযায়ী হাতিদের কয়েকটিকে ধরে ‘সবক’ শেখাতে। তাঁদের ব্যাখ্যা— দলের পান্ডাটাকে ধরতে পারলে কাজ শেষ। দলের অন্যরা নিরাপত্তার অভাবে তখন দ্রুত পাততাড়ি গোটাবে এলাকা থেকে।
বাঁকুড়ার বড়জোড়া, গঙ্গাজলঘাঁটি, গোয়ালতোড়, সোনামুখী বা লোধাশুলি জঙ্গলে কিছু ‘লোনার’ বা একাকী জীবন কাটানো হাতির স্বভাব নিয়েও সন্দিহান তাঁরা। চাইছেন, তাদেরও খোঁয়াড়ে পুরে ‘সংশোধন’ করতে।
দিন কয়েক আগে, বিহারে মোকামার চরে আবাদি জমি বাঁচাতে নীলগাই নিধনের ছাড়পত্র দিয়ে কম ঝাপটা সামলাতে হয়নি কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে।
এ বার, হাতিদের খোঁয়াড়ে পুরলে, ঝড় সামাল দিতে পারবেন তো!