রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে বিজেপি সরকার। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বুধবার নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে এই সংক্রান্ত আইন কার্যকর করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বলা হয়েছে, সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অন্তর্ভুক্ত নন যাঁরা, তাঁদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হবে। তার পর তাঁদের সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর হাতে। বিএসএফ তাঁদের সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করবে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, এক বছর আগে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত রাজ্যের জন্য এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকার তা কার্যকর করেনি।
অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘ডিটেক্ট (চিহ্নিত করা), ডিলিট (মুছে দেওয়া) এবং ডিপোর্ট (ফেরত পাঠানো)’ নীতি নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কী ভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, তা কেন্দ্রের নির্দেশিকায় বিশদ বলা আছে। এর জন্য রাজ্য প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারত নীতিগত ভাবে যে কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও অন্য দেশে থেকে যাওয়ার ঘোর বিরোধী। তা অন্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমন বিদেশের মাটিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অবৈধ অভিবাসনের কিছু নিরাপত্তাজনিত এবং আর্থসামাজিক প্রভাব রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে।
আরও পড়ুন:
কারা অবৈধ অভিবাসনকারী
- যে সমস্ত বিদেশি নাগরিক বৈধ পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন।
- বৈধ পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথি নিয়ে যাঁরা ভারতে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নিজের দেশে ফিরে যাননি।
এই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার সম্পূর্ণ অধিকার আছে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনের। অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, তাঁদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনে তাঁদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে। এই কাজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের আলাদা করে পুলিশ বাহিনী নেই বলে রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের হাতেই সমস্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অভিবাসন ব্যুরোর যুগ্ম ডিরেক্টরও এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।
কী ভাবে ফেরত পাঠানো হবে?
- বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের কেউ স্থলপথে কিংবা জলপথে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় ধরা পড়লে তৎক্ষণাৎ তাঁদের ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে। তবে তার আগে তাঁদের বায়োমেট্রিক তথ্য (মূলত আঙুলের ছাপ এবং মুখের ছবি) এবং জনতাত্ত্বিক (ডেমোগ্রাফিক) বিবরণ নিয়ে রাখবেন কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টালে (এফআইপি) এই সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করে রাখতে হবে। যেখানে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপন্ন, সেখানে অফলাইনেই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করতে হবে।
- বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর যাবতীয় তথ্য, হিসাব রাখবে সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনী। বাধ্যতামূলক ভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রতি মাসে পাঠাতে হবে।
- অনিচ্ছাকৃত ভাবে কেউ সীমান্ত পেরিয়ে এলে সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাঁদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। যদি দেখা যায় তাঁরা নির্দোষ, তবে বাংলাদেশ বা মায়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের হাতে তাঁদের তুলে দেওয়া হবে। তবে তার আগে এঁদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং কেন্দ্রের পোর্টালে আপলোড করা বাধ্যতামূলক। যদি দেখা যায় তাঁরা নির্দোষ নন, তবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের হাতে তাঁদের তুলে দেওয়া হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে।
আরও পড়ুন:
অবৈধ বসবাসকারী ধরা পড়লে?
- অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রতি রাজ্যে জেলা ধরে ধরে পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গঠন করতে হবে।
- এর জন্য প্রত্যেক রাজ্য সরকার সমস্ত জেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা শরণার্থী শিবির তৈরি করবে। সেখানে অবৈধ অভিবাসী বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের আটক করে রাখা যাবে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
- যদি এঁদের মধ্যে কেউ নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেন, তাঁদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই করতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে। উপযুক্ত প্রমাণ মিললে তাঁদের দেশ থেকে বার করে দেওয়া হবে। ওই ৩০ দিন তাঁরা ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এই থাকবেন।
- তদন্তের পর রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি বলে কাউকে যদি চিহ্নিত করা যায়, অবিলম্বে তাঁদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রের পোর্টালে আপলোড করতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশ ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত নিরাপত্তা দিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেবে। এর জন্য পুলিশের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কাগজ থাকতে হবে। তার পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী ভারত থেকে বাংলাদেশ বা মায়ানমারে ওই অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এই অনুপ্রবেশকারীদের এ দেশে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করে দেওয়া হবে।
- জরুরি পরিস্থিতিতে তদন্ত শেষ হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীকে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকেই তুলে নিয়ে যেতে পারে সীমান্তরক্ষী বা উপকূলরক্ষী বাহিনী। সরাসরি তাদের দেশের সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
- অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে কখন কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে কোন রাজ্যের পুলিশ, সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট সমস্ত রাজ্যের পুলিশের কাছে থাকবে। যাতে এই কাজের সময় কোনও ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
- সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনও অফিসারের হাতে কাকে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেই তথ্যও বিশদ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সরকারকে। এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে জমা দিতে হবে।
- যাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের নামে এ দেশে যাতে কখনও কোনও পরিচয়পত্র তৈরি না করা যায়, তা নিশ্চিত করবে কেন্দ্র। প্রয়োজন অনুযায়ী ইউআইডিএআই, নির্বাচন কমিশন, বিদেশ মন্ত্রককে এই তথ্য জানানো হবে।
- এই সংক্রান্ত কাজের জন্য অনুমোদিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য বিএসএফ এবং মায়ানমার সীমান্তের জন্য অসম রাইফেল্স।
আরও নির্দেশ
- বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের আটক করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত খরচপত্র সব সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে প্রাথমিক ভাবে বহন করতে হবে। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে তারা সেই অর্থ পেয়ে যাবে। তবে জেলায় জেলায় শরণার্থী শিবির তৈরির যাবতীয় খরচ বহন করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারই।
- অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রচার এড়ানোর আবেদনও জানিয়েছে কেন্দ্র।
- যেখানে কোনও বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করা হবে, তাঁর সম্পূর্ণ তথ্য বিদেশ মন্ত্রকের হাতে তুলে দেবে রাজ্য সরকার। বিদেশ মন্ত্রক যাতে অবিলম্বে সেই তথ্য বাংলাদেশ বা মায়ানমারের দূতাবাসে পাঠিয়ে তাঁর নাগরিকত্বের তথ্য যাচাই করে নিতে পারে।