Advertisement
E-Paper

অবস্থান বদলে কাটোয়া প্রকল্পে জমি কিনতে মধ্যস্থ সরকার

কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকারের ১০০ একর খাস জমি দেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার এনটিপিসি যাতে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে জমি কিনতে পারে, সে জন্য মধ্যস্থতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্দেশ্যেই আগামী ১০ জুন সর্বদল বৈঠক ডেকেছেন কাটোয়ার মহকুমাশাসক মৃদুল হালদার।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০১৪ ০৩:৪২
কাটোয়ায় এনটিপিসির তোড়জোড়।  ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়।

কাটোয়ায় এনটিপিসির তোড়জোড়। ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়।

কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকারের ১০০ একর খাস জমি দেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার এনটিপিসি যাতে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে জমি কিনতে পারে, সে জন্য মধ্যস্থতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্দেশ্যেই আগামী ১০ জুন সর্বদল বৈঠক ডেকেছেন কাটোয়ার মহকুমাশাসক মৃদুল হালদার। ওই দিনই প্রশাসনের উপস্থিতিতে এনটিপিসি কর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন চাষিরা। থাকবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও। প্রশাসনের একটি অংশের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর সবুজ সঙ্কেত পেয়েই বেঠক ডেকেছেন মহকুমাশাসক।

বেসরকারি শিল্প তো বটেই, সরকারি বা যৌথ প্রকল্পের জন্যও জমি অধিগ্রহণে প্রথম থেকে আপত্তি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের। এই নিয়ে শিল্পমহলের বারংবার আর্জি সত্ত্বেও নিজেদের নীতিতে অটল ছিল রাজ্য। গত বছর মুম্বইয়ের শিল্প সম্মেলনের পরে সরকারের মধ্যে শিল্পায়ন নিয়ে প্রথম সদর্থক মনোভাব দেখা দেয়। সেই সম্মেলনে মুকেশ অম্বানী-সহ দেশের প্রথম সারির একাধিক শিল্পপতি যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। রাজ্য সরকার যে শিল্প ও পরিকাঠামো গড়ার ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকাই নিতে চায়, সে কথা শিল্পপতিদের জানান মমতা। পরে অমিত মিত্রকে শিল্প মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে তিনি কাজে গতি আনতে বলেন। জমি সমস্যা নিয়ে রাজ্য সরকার বরাবরই বলে আসছিল, শিল্প করতে চাইলে এটা কোনও সমস্যা নয়। কিন্তু মুখে বললেও তা এত দিন কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এ দিনের সিদ্ধান্তের পরে শিল্পমহল মনে করছে, জমি সমস্যা মেটাতে এ বারে সত্যিই সদর্থক পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার।

কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি নিয়ে জটও দীর্ঘদিনের। এই প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি জমি (৫৫৬ একর) বাম আমলেই অধিগ্রহণ হয়ে গিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্য সরকার জানিয়ে দেয়, এর জন্য তারা আর এক ছটাক জমিও অধিগ্রহণ করবে না। বাড়তি জমি লাগলে তা এনটিপিসি-কে সরাসরি কিনে নিতে হবে। এর জবাবে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থাও জানিয়ে দেয়, সরকারের মধ্যস্থতা ছাড়া তাদের পক্ষে সরাসরি জমি কেনা সম্ভব নয়।

Advertisement

এই টানাপড়েনের ফলে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে চলতি বছরের গোড়ায় নিজেদের অবস্থান বদলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, প্রকল্পের জন্য তাঁর সরকার ১০০ একর খাস জমি দেবে। এর পরেও প্রকল্পের জন্য সংস্থাকে ২২৫ একরের মতো জমি কিনতে হতো। এর মধ্যেই অবশ্য চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কিনতে সম্মতিপত্র সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কাজ শুরু করলেও সরকারি হস্তক্ষেপ যে প্রয়োজন, তা-ও জানান এনটিপিসি-র অফিসারেরা। শুক্রবার মহকুমাশাসক বলেন, “চাষিদের কাছ থেকে কোন জমি, কত দামে কেন হবে, তা চূড়ান্ত করতেই ১০ জুন বৈঠক ডাকা হয়েছে।”

এনটিপিসি-র এক কর্তা জানান, ২২৫ একরের মধ্যে ১৫০ একরের মতো জমির মালিক ইতিমধ্যে বিক্রির ব্যাপারে সম্মতিপত্র দিয়েছেন। বাকি জমির মালিকরাও অরাজি নন। ওই জমি হাতে এলে প্রকল্প নির্মাণে আর কোনও জট থাকবে না। এতে কর্তৃপক্ষ খুশি। আগামী ১৪ জুন প্রথম বার কাটোয়ায় যাচ্ছেন এনটিপিসি-র চেয়ারম্যান অরূপ রায়চৌধুরী। এ দিন তিনি বলেন, “কাটোয়া প্রকল্প নির্মাণের কাজ শুরু এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। যে কারণে আমি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখতে যাচ্ছি।”

শুরু হয়েছে আল কাটার কাজ।—নিজস্ব চিত্র।

প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ অবশ্য ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে এনটিপিসি। বৃহস্পতিবার থেকে মূল প্রকল্প এলাকার ভিতর জমির আল কেটে রাস্তা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। গত তিন বছর ধরে কাটোয়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছেন সংস্থার কর্তারা। কিন্তু এই প্রথম সংস্থার পক্ষে শ্রীখণ্ড ফিল্ড অফিসে হোর্ডিং টাঙিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এনটিপিসি ওই এলাকায় ১৩২০ মেগাওয়েটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করতে চলেছে। প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বে থাকা সংস্থার এক কর্তা বলেন, “গত কয়েক বছর ঘরে বসে চিঠিচাপাটি করেছি। এ বার মাঠে নামলাম। প্রকল্প এলাকায় বারবার যেতে হবে, সেই কারণেই আল কেটে রাস্তা বানানো শুরু হয়েছে। পাঁচিলের ধারে বাতিস্তম্ভও বসানো হবে।

শ্রীখণ্ড ফিল্ড অফিসের বদলে প্রকল্প এলাকার ভিতরে অফিসে বসে কাজকর্ম করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

কাটোয়ার কংগ্রেস বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, কেতুগ্রামের তৃণমূল বিধায়ক শেখ শাহনওয়াজ, সিপিএমের কাটোয়া জোনাল কমিটির সম্পাদক অঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, বিজেপি-র বর্ধমান জেলার সাধারণ সম্পাদক অনিল দত্তরা আশাবাদী। তাঁরা বলেছেন, “আমরা এনটিপিসি-কে সব রকমের সাহায্য করতে প্রস্তুত। চাষিদের কাছ থেকে জমি কিনতে কোনও সমস্যা হলে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করব।”

মূল প্রকল্প হবে শ্রীখণ্ড, দেবকুণ্ডু ও চুড়পুনি মৌজায়। তিন ফসলি চাষের জমিও প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য দিতে রাজি হয়েছেন ৯৭%-এর বেশি চাষি। তাঁদের বক্তব্য, “প্রকল্পের স্বার্থে আমরা জমি দেব বলে লিখিত ভাবে এনটিপিসি-কে জানিয়েছি।” সংস্থা সূত্রে খবর, সরকার যে ১০০ একর খাস জমি এনটিপিসি-কে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এখনও হস্তান্তর হয়নি। কাটোয়া-১ বিএলএলআরও রমেশচন্দ্র গায়েন বলেন, “বিভিন্ন দফতরের হাতে থাকা বেশ কিছু জমি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট করা হয়েছে। ১০ জুন এসডিও অফিসে বৈঠকের পর সেই প্রক্রিয়ায় আরও গতি আনা হবে।”

প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কাটোয়ায় এই প্রকল্প হওয়ার কথা। জমিজট থাকায় এনটিপিসি-র পরিচালন পর্ষদ ওই প্রকল্পের জন্য এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দিচ্ছিল না। অবশেষে মুখ্যমন্ত্রী মনোভাব বদল করায় পরিচালন পর্ষদ দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কাজের জন্য বাজারে দরপত্রও ছাড়া হয়েছে। সম্প্রতি কাটোয়া প্রকল্পের জন্য পরিবেশ মন্ত্রকেরও ছাড়পত্রও পাওয়া গিয়েছে বলে সংস্থা সূত্রে খবর।

সহ-প্রতিবেদন: পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়।

aoumen dutta government would work as a mediator for land in katwa thermal power plant
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy