পুজোর প্রণামী জমা করার বাক্সের মতো বড় বড় ‘কমপ্লেন বক্স।’ গ্রামে, শহরে সর্বত্র। প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হোক কিংবা বিশেষ কোনও তথ্য— মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি কিছু জানাতে হলে সেটা লিখে বাক্সে ফেলে দিলেই হল!
রেওয়াজটা চালু করেছিলেন এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী শিবাজি রাও। বাস্তবে নয়, বলিউড সিনেমার রূপোলি পর্দায়। বিধানসভা ভোটের মুখে এ বার কতকটা যেন সেই ঢঙেই পা ফেলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। নবান্নের সিদ্ধান্ত: সুষ্ঠু পরিষেবা জোগানের তাগিদে নাগরিকদের থেকে ই-মেল, এসএমএস মারফত অভিযোগ গ্রহণ করা হবে। সেই মতো প্রতিকারের প্রয়াস চলবে।
হঠাৎ এই পদক্ষেপের কারণ কী?
নবান্ন-সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোড়া থেকেই বলে আসছেন, শুধু প্রশাসনের সদরে বসে তিনি সরকার চালাবেন না। এ যে স্রেফ কথার কথা নয়, তা বোঝাতে সাড়ে চার বছরে জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকের সেঞ্চুরিও সেরে ফেলেছেন তিনি। অথচ তার পরেও বহু ক্ষেত্রে সরকারি পরিষেবার ছোঁয়া সাধারণের কাছে পৌঁছনো দূর, দফতরের চৌকাঠই পেরোচ্ছে না বলে অভিযোগ।
এমতাবস্থায় নতুন উদ্যোগের গোড়াপত্তন হতে চলেছে। কিন্তু তা কতটা কার্যকর হবে, সে সম্পর্কে প্রশাসনের অন্দরেই প্রশ্ন প্রকট। বস্তুত জনগণের সমস্যা-অভিযোগ নিরসনের লক্ষ্যে চালু বিবিধ প্রয়াসের হাল দেখে এই মহল বিশেষ আশাবাদী হতে পারছে না। কী রকম?
ক্ষমতায় এসে বাইশটি দফতরের বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে জন-পরিষেবা আইন চালু করেছিলেন মমতা। যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল, দ্রুত সরকারি পরিষেবা জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাতে আশানুরূপ ফল মেলেনি বলে প্রশাসনের কর্তাদের একাংশ স্বীকার করছেন। নবান্নের খবর: তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় বসার পরে পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে নিয়মিত ‘জনতার দরবার’ বসত। যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের (সিএমও) অফিসারেরা আমজনতার অভাব-অনুযোগ শুনতেন। তার পাট কার্যত উঠে গিয়েছে। সিএমও-র দু’-এক জন গেলেও জনতার দরবারে এখন জনতারই দেখা মেলা ভার। ‘‘বারবার বলেও সমস্যার প্রতিকার না-পেয়ে ওঁরা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।’’— মন্তব্য নবান্নের এক আধিকারিকের। উপরন্তু মমতা জমানার প্রথম দিকে সিএমও-য় যেমন চিঠির পাহাড় জমত, তা এখন চোখে পড়ে না। আবার তথ্য জানার অধিকার আইনে আরটিআই) চিঠি দিয়েও বহু লোককে হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হচ্ছে।
অর্থাৎ, সমস্যা সুরাহার একাধিক বন্দোবস্ত চালু থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে। এ বার এসএমএস, ই-মেলে একই অভিযোগ নিলেও কাজের কাজ কী হবে, তা অনেক আমলা-কর্মীর মাথায় ঢুকছে না।
নবান্নের শীর্ষ মহল যদিও এ সব ধন্দ-সংশয়ে আমল দিতে নারাজ। জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওয়েবসাইট ‘বাংলার মুখ’-কে তথ্য-সংস্কৃতি দফতর ঢেলে সাজছে। তার মাধ্যমেই ই-মেল, এসএমএসে অভিযোগ নেওয়া হবে। কী ভাবে, কোথায় নালিশ পেশ করতে হবে, তা-ও বলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে ত্রুটি বা দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে ই-মেল করা যাবে banglarmukh.gov.in ঠিকানায়। কিংবা ১৬৬ নম্বরে এসএমএস। প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই রয়েছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
প্রতিকারের প্রক্রিয়া কেমন হবে?
এ সম্পর্কে গত মাসে অন্যান্য দফতরকে লিখিত ভাবে বিস্তারিত জানিয়ে দিয়েছেন তথ্য-সংস্কৃতির সচিব অত্রি ভট্টাচার্য। তাঁর চিঠিতে বলা হয়েছে, ই-মেল, এসএমএসে আসা যাবতীয় অভিযোগ পত্রপাঠ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে। দফতরের নোডাল অফিসার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন, বিভাগীয় সচিবের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের বক্তব্যও নিতে হবে। যে দফতরের বিরুদ্ধে নালিশ, অভিযোগকারীকে জবাব দেবে তারাই। ‘প্রাথমিক জবাব চাই চারটি কাজের দিনের মধ্যে। তখনও সমস্যা না-মিটলে জানিয়ে দিতে হবে, কত দিনে প্রতিকার মিলবে।’— লিখেছেন তথ্য-সংস্কৃতি সচিব।
সময় মতো উত্তর দিলে কিংবা সুরাহা আদৌ করতে না-পারলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা হবে কি?
সচিবের চিঠিতে এটা অবশ্য খোলসা করা হয়নি। ফলে প্রশাসনের একাংশের পাশাপাশি বিরোধীরাও উদ্যোগটির কার্যকারিতা নিয়ে ঘোরতর সন্দিহান। ‘‘যে সরকার কোনও সমালোচনাই শুনতে চায় না, তারা আবার মানুষের অভিযোগের কী সমাধান করবে?’’— কটাক্ষ করেছেন সিপিএমের মহম্মদ সেলিম। বিজেপি’র শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘তোলাবাজি আর মস্তানরাজের বিরুদ্ধেই মানুষের সবচেয়ে বেশি নালিশ। সরকার আগে তার সুরাহা করুক।’’
‘নায়ক’ ছবিতে কাল্পনিক মুখ্যমন্ত্রী শিবাজি রাওয়ের ‘দুর্নীতি দমন’ অভিযান জনমানসে দুরন্ত সাড়া ফেলেছিল। বাস্তবের মুখ্যমন্ত্রীর প্রয়াস কতটা সার্থক হয়, সময়ই বলবে।