Advertisement
E-Paper

উপকূল আইনের গেরোয় ঝড়খালি

কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক ২০১১ সালে ‘উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ আইন’ তৈরি করেছিল। তার পরেও কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঝ়ড়খালি পর্যটন প্রকল্প তৈরি করল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুভাশিস ঘটক

শেষ আপডেট: ২৯ জুলাই ২০১৫ ০৩:৪২
ঝড়খালিতে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল কেটে তৈরি হচ্ছে রাস্তা। — নিজস্ব চিত্র

ঝড়খালিতে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল কেটে তৈরি হচ্ছে রাস্তা। — নিজস্ব চিত্র

কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক ২০১১ সালে ‘উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ আইন’ তৈরি করেছিল। তার পরেও কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঝ়ড়খালি পর্যটন প্রকল্প তৈরি করল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে কারণ দেখিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতের পূর্বাঞ্চলীয় শাখা সম্প্রতি সুন্দরবনের বেশ কয়েকটি হোটেল বন্ধের নির্দেশ জারি করেছে, সেই একই কারণে ঝড়খালি পর্যটন প্রকল্পও বাতিল হবে না কেন— সেই প্রশ্ন উঠেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায় একাধিক প্রশাসনিক বৈঠক ও জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন— সুন্দরবনকে আফ্রিকান সাফারির সমতুল্য পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। শুধু ঘোষণাই নয়, পর্যটন দফতর এবং দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের কর্তাদের একাধিক বৈঠকে সুন্দরবন এলাকায় পর্যটন প্রসারে গতি আনার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গত চার বছরে বার তিনেক তিনি শিল্পপতিদের নিয়ে সুন্দরবনে গিয়েছেন। পর্যটন শিল্প বিস্তারেই এই সফর হচ্ছে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছিল।

পালা বদলের পর পর্যটন প্রসারে রাজ্য সরকারের তরফে প্রথম পদক্ষেপটিই ছিল সুন্দরবনে বাসন্তীর ঝড়খালি এলাকায় প্রায় ৬৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা। ওই জমিতে পুরোটাই ম্যানগ্রোভের জঙ্গল ছিল, যা কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছে। ওই জমি লাগোয়া নদীপথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই নদীর খাঁড়িতে ছিল কুমিরের প্রসবকালীন আস্তানা। বন দফতর সূত্রে খবর, গত বছরেও প্রায় ৭০টি কুমির ছানা ওই নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে। সেই নদীপথ এখন বন্ধ। সেখান দিয়ে পর্যটন প্রকল্পের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে।

জাতীয় পরিবেশ আদালত সুন্দরবনে জঙ্গল রক্ষায় ‘উপকূল অঞ্চল আইন’ প্রয়োগ করতে উদ্যোগী হওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রীর ওই সাধের প্রকল্পের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে খোঁজখবর নিতেই উঠে এসেছে নানা তথ্য। অভিযোগ, সুন্দরবন উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় ঝড়খালি পঞ্চায়েতকে অন্ধকারে রেখেই এই প্রকল্প গড়ার কাজ শুরু করেছিল রাজ্য পর্যটন দফতর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসন এখনও অন্ধকারেই রয়েছে। ঝড়খালি পঞ্চায়েতের প্রধান দিলীপ মণ্ডল বলেন, ‘‘আজ পর্যন্ত আমরা কোনও লিখিত নির্দেশ পাইনি। তবে বছর খানেক আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের তরফে মৌখিক ভাবে আমাদের ওই এলাকার ম্যানগ্রোভের জঙ্গল কেটে সাফ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমরা তা কিছুটা করেওছি।’’

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মাস খানেক আগে বারুইপুরে প্রশাসনিক বৈঠকেও ঝড়খালি পর্যটন প্রকল্প রূপায়ণে ঢিলেঢালা পরিস্থিতি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকী ঠিকাদার পাল্টানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। শুধু ঝড়খালি নয়— গোসাবা, সাগর, নামখানা, কাকদ্বীপ এলাকায় পর্যটন প্রসারে রাজ্য সরকার বহু কটেজ তৈরি করেছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত চার বছরে সুন্দরবনে পর্যটন প্রসারে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। গঙ্গাসাগরে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেগুন কাঠের কটেজ তৈরি করা হয়েছে— যা সাগর থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। অভিযোগ, এগুলির সব ক’টিই উপকূল নিয়ন্ত্রণ আইনের পরিপন্থী।

রাজ্য বন দফতরের এক প্রাক্তন আমলার বক্তব্য, ‘‘জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশে যদি রাজ্য পরিবেশ দফতর হোটেল ও রিসর্ট বন্ধ করে দিতে পারে, তবে ঝড়খালির পর্যটন প্রকল্পই বা বাতিল হবে না কেন? ওই প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যেই সুন্দরবনের জীবমণ্ডলে প্রভাব পড়েছে। বিষয়টি জাতীয় পরিবেশ আদালতের দেখা উচিত।’’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক পরিবেশ সংস্থা বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হতে চলেছে।

জীবমণ্ডলের ক্ষতি করে কোনও পর্যটন প্রকল্প গড়ার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য তুষার কাঞ্জিলালও। তিনি বলেন, ‘‘সুন্দরবনে পর্যটন প্রসারের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু জীবমণ্ডলের ক্ষতি করে কিছুই করা উচিত নয়।’’ প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ও ঝড়খালি প্রকল্প নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তাঁর মন্তব্য, ‘‘বিজ্ঞপ্তি থাকা সত্ত্বেও এক রকম জোর করে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সাফ করা হয়েছে, জীবমণ্ডলের ক্ষতি করা হচ্ছে।’’

রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘‘পরিবেশ দফতর অনুমোদন দিয়েছিল বলেই আমরা ওই প্রকল্প গড়ছি।’’ পরিবেশ মন্ত্রী সুদর্শন ঘোষদস্তিদারেরও দাবি, ‘‘রাজ্য সরকার সব নিয়ম মেনেই ওই এলাকায় পর্যটনের প্রসার করছে।’’ তবে পরিবেশবিদেরা পরিবেশমন্ত্রীর এই মন্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেকের মতে, মুখ্যমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই সব দিক খতিয়ে না-দেখে তড়িঘড়ি অনুমোদন দিয়েছে সরকারি দফতরগুলি।

সম্প্রতি রাজ্য সরকার উপকূলবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ আইনকে শিথিল করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করেছে। সুন্দরবনের বাসিন্দাদের রুজি-রোজগার খোয়ানোর বিষয়টিকে হাতিয়ার করা হয়েছে ওই চিঠিতে। কারণ, উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ক্যানিং, সাগর, জয়নগর, কাকদ্বীপ, নামখানা— সব পর্যটনকেন্দ্রই পড়ে যাচ্ছে। ওই আইন মানতে গেলে ওই সব এলাকায় কোনও নির্মাণই করা যাবে না। কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ‘‘উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন আদালতের নজরে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী সাধের প্রকল্প বাঁচাতেই সুন্দরবনের রুজি-রুজির অজুহাত দিয়ে আইন শিথিল করার আর্জি জানিয়েছে রাজ্য সরকার।’’ পরিবেশ মন্ত্রী সুদর্শন ঘোষদস্তিদার অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘‘বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই ওই চিঠি লেখা হয়েছে।’’

কেন্দ্রীয় সরকার আইন শিথিল করলে ভাল, না হলে পরিবেশ আদালতের সিদ্ধান্তের উপরেই ঝুলছে ঝড়খালির পর্যটন প্রকল্প।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy