শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এসজেডিএ) কাজকর্মে বোর্ডের ভূমিকা ঠিক কী, তা জানতে চাইলেন বিচারক। সোমবার দুপুরে শিলিগুড়ির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক অজয়কুমার দাসের আদালতে সংস্থার প্রাক্তন সিইও গোদালা কিরণকুমারের বিরুদ্ধে থাকা ছয়টি মামলার জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী। শুনানির সময় ওই স্বশাসিত সংস্থার কাজের ধরণ নিয়ে জানতে চান বিচারক। ছয়টি মামলার মধ্যে দুটি শোনার পর আজ, মঙ্গলবার ফের বাকি চারটি মামলা শুনানি হবে। সেই সময়ই বিচারক, বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে বিশদে জানতে চান।
এ দিনই, এসিজেএম আদালতে গোদলাকে ১৪দিন জেল হেফাজতের পর হাজিরও করানো হয়। কিন্তু সেই সময় উচ্চ আদালতে জামিনের শুনানি চলতে থাকায় তাঁকে কিছু ক্ষণের মধ্যেই ফের শিলিগুড়ি সংশোধনাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালে মামলার তদন্তকারী অফিসার গৌতম ঘোষালকে চেম্বারে ডেকে নিয়ে মামলার বিস্তারিত খুঁটিনাটিও বিচারক জেনেছেন বলে আদালত সূত্রের খবর।
আদালত সূত্রের খবর, প্রায় ঘন্টা দু’য়েক ধরে চলা সওয়াল জবাবের মধ্যে বিচারক এসজেডিএ বোর্ডের কাজকর্মের পরিধি এবং ধরন নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চান। বিচারকের প্রশ্ন ছিল, সংস্থার গঠন কী ভাবে হয়েছে, বোর্ডে সিইও-র ভূমিকা কী রকম? সেই সঙ্গেই তিনি জানতে চান, কোনও প্রকল্পের সমস্ত কাজ সিইও করেন না বাকি বোর্ডেরও বিষয়টি দেখার কথা?
গোদালার আইনজীবী তড়িৎ ওঝা প্রথমেই আদালতে জানিয়ে দেন, ‘ওয়েস্টবেঙ্গল টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং’-১৯৭৯ আইন অনুসারে এই ধরনের স্বশাসিত সংস্থা গঠন হওযার কথা। কিন্তু কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ছাড়া কোথাও সিইও পদের কথাই নেই। তবে একজন সরকারের মেম্বর সেক্রেটারি থাকার কথা। এসজেডিএ-তে কী করে গঠন হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। আর কোনও প্রকল্পের ক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্তই কার্যকরী করা হয়। সেক্ষেত্রে ‘সিইও’ হিসাবে গোদালা একই সব করছেন, তা মেনে নেওয়াটা মুশকিল।
তড়িৎবাবু আদালতে নথি দিয়ে জানান, এসজেডিএ-র বোর্ড (১১৩ ও ১১৪) মিটিঙে কতগুলি প্রকল্পের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই মতন কাজ শুরু হয়। গোদলা সিইও হিসাবে সার্বিক কাজের দেখাশুনো করেছেন। ভুয়ো মাপজোকের বই, নথিপত্র বাস্তুকারেরা তৈরি করে জমা দিয়েছেন। তার ভিত্তিতেই আইএএস অফিসার গোদালা কিরণকুমার তৈরি কাগজপত্রে শুধু সই করে টাকা দিয়েছেন। এই ভাবেই প্রায় ৭৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সিআইডি আদালতে অভিযোগ করেছে। ঠিকাদার, বাস্তুকারদের কাছ থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। গোদলা কিরণকুমারের বাড়ি, অ্যাকাউন্টে তল্লাশি করেও এখনও সিআইডি কিছুই পায়নি। আজ, মঙ্গলবার আবার তাঁরা তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সওয়াল করবেন।
এই সময়ই বিচারক সরকারি আইনজীবীর কাছে জানতে চান, ‘‘বোর্ডের কাজ কী শুধু প্রকল্প ঠিক করা? এস্টিমেট, টেন্ডার, ওয়ার্কওর্ডার, পেমেন্টগুলি কী বোর্ড দেখভাল করে না?’’
সেই সময় সরকারি আইনজীবী পীযূষ ঘোষ আদালতে জানান, সিইও-র সংস্থার সদস্য সচিব। বোর্ড শুধু কী কাজ হবে তার সিদ্ধান্ত নেয়। সেগুলি বাস্তবায়িত করার কাজ সিইও তথা বাস্তুকার এবং অফিসারদের। একেই ব্যবহার করে দুর্নীতি করা হয়েছে। ই-টেন্ডারে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছেন গোদালা। কাজের জমা পড়া দরপত্রের থেকে প্রতিটি প্রকল্পেই প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তার পরে ভুয়ো নথিপত্র জমা দিয়ে কাজ না করে ঠিকাদারকে টাকা দেওয়া হয়েছে। শেষে, সেই টাকার একটি অংশ ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে অন্ধ্রপ্রদেশে পৌঁছেছে। সেই টাকা উদ্ধারের জন্য গোদালার হেফাজতে থাকাটা প্রয়োজন।
সব শোনার পর আজ, ফের নতুন করে মামলার শুনানির দিন ধার্য করেন বিচারক।
সিআইডি সূত্রের খবর, গত ২০১২-১৩ সাল এসজেডিএ একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে সামনে এসেছে। ময়নাগুড়ি, মালবাজার, বাগডোগরায় বৈদ্যুতিক শ্মশান চুল্লি, শিলিগুড়িতে সিসিটিভি, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, সাব স্টেশন-সহ একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় ৭৬ কোটি টাকা কার্যত কোনও কাজ না সরবরাহ না করেই পেমেন্ট করা হয়। গত ২০০১৩ সালে নভেম্বর মাসে সিসিটিভি মামলায় গ্রেফতার হয়ে দুই দিনের মাথায় জামিন পান গোদালা। এর পরে গত ১৫ জুলাই তিনি ময়নাগুড়ি শ্মশানঘাটের মামলায় গ্রেফতার হয়। ওই মামলার চার্জশিটও জমা পড়েছে। তাতে বোর্ডের একাধিক সদস্যকে সাক্ষীও করা হয়েছে। সম্প্রতি চার্জশিট হওয়া মামলায় দার্জিলিঙের স্পেশাল কোর্ট থেকে জামিনও পেয়েছেন গোদালা। এখনও তার বিরুদ্ধে বাকি ছয়টি মামলা চলছে। এদিন গ্রেফতারের ৬১ দিন পর গোদালাকে আদালতে তোলা হয়েছিল।