জমি-নীতির কারণে বড় তো দূরস্থান, মাঝারি বা ছোট শিল্পও সে ভাবে পা রাখছে না রাজ্যে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও শাসকদলের মদতে পুষ্ট সিন্ডিকেট-রাজের রমরমা। যার ধাক্কায় বেশ কিছু কল-কারখানা ইতিমধ্যেই ঝাঁপ গুটিয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের করুণ দশা নিয়ে মুখ খুলে কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয় জানিয়ে দিলেন, কারখানা লক-আউটে দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ! একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, এ রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে যে রকম নেতিবাচক আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে, তাতে কেন্দ্র উদ্বিগ্ন।
শনিবার মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালটি পরিদর্শনে এসেছিলেন বন্দারু। সেখানেই সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “আমি গত দু’বছরের রিপোর্ট ঘেঁটে দেখলাম, লক-আউটে পশ্চিমবঙ্গই প্রথম! রাজ্যের ক্ষেত্রে এটা যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে চা বাগানগুলির অবস্থা খুবই শোচনীয়।” কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মতে, এ রাজ্যে শিল্পে আরও বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু তার জন্য দরকার শিল্পের উপযোগী ইতিবাচক পরিবেশ এবং সে জন্য সুশাসন অত্যন্ত জরুরি।
রাজ্যে এসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এমন অভিযোগে বেজায় চটেছেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী মলয় ঘটক। শ্রম দফতর সূত্রে বলা হচ্ছে, বন্দারুর সাংবাদিক বৈঠকে মলয়বাবুরও থাকার কথা ছিল। কিন্তু সাংবাদিক বৈঠক শুরুর কিছু ক্ষণ আগে অন্য একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে হাসপাতাল ছাড়েন তিনি। পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবিকে ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে মলয়বাবু বলেন, “রাজ্যে কোনও কারখানায় লকআউট হয়নি। যা হয়েছে, তা সাসপেনশন অব ওয়ার্ক। সে ক্ষেত্রেও ৯৫% ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে কারখানা খোলা হয়েছে।”
শিল্পকর্তাদের অনেকেই বলছেন, মলয়বাবুর চটে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত বছর দুয়েক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বারেবারে দাবি করেছে, তৃণমূল শাসনে রাজ্যে শ্রমদিবস নষ্টের হার প্রায় শূন্য। সেখানে লক-আউটে শীর্ষে থাকার অর্থ, রাজ্যের ওই দাবি ভিত্তিহীন। তাই মলয়বাবুকে মুখ খুলতে হয়েছে।
নিজের দাবির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে মলয়বাবু জানান, লক-আউট এবং সাসপেনশন অব ওয়ার্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটির অর্থ অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টির অর্থ, সাময়িক কর্মবিরতি। এই প্রসঙ্গেই তাঁর অভিযোগ, এ রাজ্যে সাসপেনশন অব ওয়ার্ক হয়েছে চটকলে এবং এর জন্য কেন্দ্রই দায়ী। মলয়বাবুর কথায়, “ওরা চটশিল্পটাকেই তুলে দিতে চাইছে!”
শ্রম দফতরের অনেক কর্তা কিন্তু মন্ত্রীর বক্তব্য মানতে নারাজ। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, লকআউট এবং সাসপেনশন অব ওয়ার্ক দুটোই আসলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। এবং যেটাই ঘটুক, তাতে শ্রমদিবসই নষ্ট হয়। কাজ থাকে না শ্রমিকের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়তো সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু ব্যাকরণগত পার্থক্য দেখিয়ে মলয়বাবু সেই বক্তব্যকে খণ্ডন করতে চেয়েছেন!
বন্দারু এ দিন জানান, পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নে কেন্দ্র সব রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত। সেই লক্ষ্যে শ্রমিক-মালিক সমস্যা সমাধানে মলয়বাবুকে দিল্লি গিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধও করেছেন তিনি। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সেই অনুরোধ মলয়বাবু মানবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমকর্তাদের একাংশের বক্তব্য, যেখানে ‘ব্যস্ততা’র কারণ দেখিয়ে বাজেট প্রস্তুতি নিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বৈঠকে যান না রাজ্যের অর্থমন্ত্রী, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া মন্ত্রী-সান্ত্রীরা দিল্লি যাবে না বলে নির্দেশ জারি করা হয়, সেখানে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীর ডাকে মলয়বাবুর দিল্লি যাওয়া কার্যত অসম্ভব। শ্রমকর্তাদের বক্তব্য, অন্তত এখন যা পরিস্থিতি, তাতে এটা ভাবাই যায় না!
এ দিন ইএসআই হাসপাতাল ও কর্মসংস্থান নিবষয়ে এক গুচ্ছ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। জানান, ইএসআই হাসপাতাল পরিচালনা প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণ চাইছে কেন্দ্র। এর জন্য প্রতি রাজ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি তৈরি হয়েছে যারা সুষ্ঠু ভাবে হাসপাতাল চালানোর ক্ষেত্রে অধিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বন্দারু জানান, রাজ্যের ইএসআই হাসপাতালগুলিতে পরিষেবার মান সন্তোষজনক হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গকে ২৩ কোটি টাকা উৎসাহ ভাতা দেওয়া হয়েছে।