বাইরে পৌষের ঠান্ডা। ঘরে লেপের আশ্রয়ে গভীর ঘুমে সবাই। হঠাৎই খাটশুদ্ধ ঘরটা কেঁপে উঠল। তাতেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল চুঁচুড়ার চকবাজারের দেবব্রত সাধুর। প্রথমে ভেবেছিলেন শরীর বিগড়েছে। সম্বিত ফিরতে ধরফরিয়ে উঠে বসেন। ঘড়ির কাঁটায় ভোর সাড়ে ৪টে। ততক্ষণে স্ত্রী মৌসুমিদেবী এবং ছেলে বিশ্বরূপও উঠে বসেছেন। মাথার উপরে পাখাটা তখন আপনাআপনি ঘুরে চলেছে। তৎক্ষণাৎ দৌ়ড়ে ঘর থেকে রাস্তায় চলে আসেন তিন জন।
দেবব্রতবাবু একা নন, মণিপুরে উদ্ভুত ভূমিকম্পের প্রভাবে ভূমিকম্পের আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন হাওড়া ও হুগলির অনেকেই। চুঁচুড়া, বলাগড়, সিঙ্গুর, তারকেশ্বর-সহ নানা জায়গায় কুয়াশামাখা কাকভোরেই শাঁখ বাজতে থাকে। দেবব্রতবাবুর ঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরে যায়। তাঁর কথায়, ‘‘খাটের দুলুনি আর গ্রিলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। কেউ কেউ শাঁখ বাজাচ্ছিলেন। দেরি না করে ঠান্ডার মধ্যেই একেবারে রাস্তায় চলে আসি।’’ ঘণ্টাখানেক বাইরেই স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দেবব্রতবাবু। তিনি জানান, তাঁদের মতোই অনেকেই তখন বাইরে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। সকলে মিলে আলোচনার মাঝেই ফের কম্পন অনুভূত হয়।
মৌসুমিদেবী বলেন, ‘‘খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। নেপালের ভূমিকম্পের কথা মনে পড়ছিল।’’ তখনও অবশ্য পরিবারটি জানে না তাঁদের ঘরেও ফাটল ধরিয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ভোরের আলো ফোটার পরে তা নজরে আসে। দেওয়ালে চিড় ধরে যাওয়ায় বাড়ি থাকতে ভয় পাচ্ছে পরিবারটি।
খাঁট দুলতে থাকায় ঘুম ভেঙে যায় তারকেশ্বরের কেশবচক গ্রামের বধূ মৌসুমি পালেরও। তিনি জানান, একে একে বাড়ির সকলেই জেগে ওঠেন। ওই সময়েই আতঙ্কে পরিচিতদের দু’এক জনকে ফোনও করেন পাল পরিবারের সদস্যেরা। টিভি চালানো হয়।
ভূমিকম্প টের পেয়ে চন্দননগরের বড়বাজারের একটি আবাসনের বাসিন্দারা রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। ওই আবাসনের বাসিন্দা সজল বটব্যালের কথায়, ‘‘আমরা ফ্ল্যাটের চারতলায় থাকি। আতঙ্কে দ্রুত নীচে নেমে আসি।’’ সকাল সওয়া চারটে নাগাদ ঘুম থেকে উঠেছিলেন সিঙ্গুর-১ পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য, স্থানীয় জলাঘাটা এলাকার বাসিন্দা রানা চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানান, কিছুক্ষণ পরেই সিলিং ফ্যান, খাট এবং অন্য আসবাব দুলতে থাকে। তিনি বলেন, ‘‘ভূমিকম্প টের পেতেই মাকে ডাকি। মা-ও তখন জেগে গিয়েছিলেন। তবে ভূমিকম্প বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
একই ছবি হাওড়াতেও। বেজে ওঠে শাঁখ। শোনা যায় আজান। কোনও কোনও এলাকার বাসিন্দারা বাড়ির বাইরে বাকি সময় কাটান। সকালে বাড়ি ঢোকেন। জয়পুরের বাসিন্দা সমর অধিকারী, কমলা দলুইরা বলেন, ‘‘হঠাৎ বুঝতে পারি খাট নড়ছে। প্রথমে মনে হয় মাথা ঘুরছে। কিন্তু কিছু পরেই ঘোর কাটে। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসি। আতঙ্কে সকাল পর্যন্ত ঘরে ঢুকতে পারিনি।’’ শ্যামপুরের বাসিন্দা উত্তম বায়চোধুরী বাড়ির দোতলায় ঘুমিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘খাট নড়ে ওঠায় ঘুম ভেঙে যায়। কোনও রকমে বেরিয়ে আসি।’’
একই অনুভূতি আরও অনেকের।