সরকারি বাতানুকূল বাস থেকে হই হই করে নেমে পড়েছেন একদল পর্যটক। চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে এসে চারপাশ দেখার পরে মুগ্ধ দাশরথি ঘোষ, প্রতিমা ভট্টশালীরা পর্যটন দফতরের কর্মীর কাছে জানতে চান মন্দিরের ইতিহাস। গহিন জঙ্গলের মাঝে কীভাবে শুরু হয়েছিল নীলবসনা চর্তুর্ভুজা দেবীর অধিবাস? পর্যটন দফতরের কর্মী প্রফুল্ল দাসের অবস্থা তখন বই না পড়ে পরীক্ষা দিতে আসার মতো। আমতা আমতা করে প্রসঙ্গ পাল্টে তখন প্রফুল্লবাবুকে বলতে হয়, ‘দেখুন ডুলুং নদীটা কী সুন্দর!’ ক্লাস সেভেনের পড়ুয়া বেলঘরিয়ার সৌম্য ভট্টাচার্যর মতো ছোটরা কিন্তু জানতে চায়, তিরতিরে নদিটা এসেছে কোথা থেকে? সত্যিই তো এসব জেনে নেওয়া দরকার! মানছেন প্রফুল্লবাবু। কিন্তু তিনি তো আর গাইড নন। প্রফুল্লবাবু পর্যটকদের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
মাস খানেক হল, রাজ্য পর্যটন দফতর ঝাড়গ্রাম ও বেলপাহাড়ি কেন্দ্রিক সরকারি প্যাকেজ ট্যুর চালু করেছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কয়েক দফায় পর্যটকরা বেড়িয়ে গিয়েছেন। অথচ সেই প্যাকেজ ট্যুরে গাইডের ব্যবস্থা নেই। ফলে জঙ্গলমহলে বেড়াতে এসে দ্রষ্টব্য জায়গাগুলির ইতিহাস ও তথ্য সঠিক ভাবে জানতে পারছেন না পর্যটকরা। দিল্লির বাসিন্দা প্রবীণ মধুসূদন রায়চৌধুরী, চন্দননগরের সীমা বন্দ্যোপাধ্যায়-রা ঝাড়গ্রামে প্রথমবার এসে অভিভূত। কিন্তু তাঁদেরও পরামর্শ, গাইড থাকলে বেড়ানোটা আরও সার্থক হতো।
পর্যটন উন্নয়ন নিগমের প্যাকেজ ট্যুরে বাতানুকুল বাসে করে কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রামে এক রাত দু’দিনের জন্য পর্যটকদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ঝাড়গ্রামে পর্যটকদের থাকার জন্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ঝাঁ চকচকে ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে। সেখানে মনোরম পরিবেশে থাকা ও খাওয়ার তোফা ব্যবস্থা। পর্যটকরাও ঘুরে আনন্দ পাচ্ছেন। বড়দিনের ছুটিতে প্যাকেজ ট্যুরে পর্যটকদের ঝাড়গ্রাম, গোপীবল্লভপুর ও নয়াগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘোরানো হয়েছিল। কয়েকদিন আগেও একঝাঁক পর্যটক ঝাড়গ্রাম, জামবনি ও বেলপাহাড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় এলাকায় বেড়াতে এসেছিলেন।
পর্যটকদের একাংশ বলছেন, বেসরকারি প্যাকেজ ট্যুরগুলিতে কাজ চালানোর মতো গাইড থাকে। কিন্তু সরকারি প্যাকেজ ট্যুরে সচরাচর গাইড থাকে না। কিন্তু অনেক জায়গায় বেসরকারি গাইড পাওয়া যায়। কিন্তু ঝাড়গ্রামের পর্যটনস্থল গুলিতে গিয়ে বেসরকারি গাইড মেলে না। দিনকয়েক আগে সরকারি প্যাকেজ ট্যুরে আসা পর্যটকরা ঝাড়গ্রাম মিনি চিড়িয়াখানায় গিয়ে বন্যপ্রাণীদের সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জানতে চাইছিলেন। বস্তুতপক্ষে, জঙ্গলমহলে মাওবাদী অশান্তিপর্বের সময় ২০০৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর এই চিড়িয়াখানায় হামলা চালিয়েছিল মাওবাদী-জনগণের কমিটির লোকেরা। ভাঙচুর করে লুঠ করা হয়েছিল দু’টো কৃষ্ণসার হরিণ। তারপর গত পাঁচ বছরে চিড়িয়াখানাটির ভোল বদলে গিয়েছে। ঝাড়গ্রামের একটি বেসরকারি পর্যটন সংস্থার কর্ণধার সুমিত দত্ত বলেন, “সংবাদমাধ্যমে জঙ্গলমহলের নানা বিষয় দেখার পর পর্যটকদের বাড়তি কৌতুহল হওয়াটা স্বাভাবিক। এ জন্য আমরা স্থানীয় কিছু যুবকদের গাইডের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আরও পেশাদার গাইড তৈরির জন্য আমরা খুব শীঘ্রই কর্মশালা করব।”
পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের এমডি সি মুরুগন বলেন, “ঝাড়গ্রামের স্থানীয় আগ্রহী যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইডের কাজে নামানোর জন্য চিন্তাভাবনা হচ্ছে।” তাঁর দাবি, সরকারি প্যাকেজ ট্যুরে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার মানের গুণগত মান অত্যন্ত ভাল। রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে ঝাড়গ্রামকে তুলে ধরার জন্য আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ করা হবে বলে জানান তিনি।