Advertisement
E-Paper

গাড়ি বদলে যায়, পাচার চলতেই থাকে

‘প্রেস, ‘পুলিশ’-এর পরে এ বার সেই তালিকায় নয়া সংযোজন শাসক দলের নেতাদের পছন্দের দুধ সাদা স্করপিও।

সুজাউদ্দিন

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:১২
গাড়ি দিয়ে যায় চেনা!

গাড়ি দিয়ে যায় চেনা!

‘প্রেস, ‘পুলিশ’-এর পরে এ বার সেই তালিকায় নয়া সংযোজন শাসক দলের নেতাদের পছন্দের দুধ সাদা স্করপিও।

তবে সবসময় সেই গাড়িতেও যে শেষরক্ষা হচ্ছে, এমন নয়। যেমন হয়েছে বুধবার রাতে। রানিনগরের রামনগরপাড়া দিয়ে কাহারপাড়া সীমান্তের দিকে দ্রুত গতিতে ছুটছিল একটি স্করপিও। মাঘের সুনসান রাতে আচমকা সেই গাড়ির পথ আটকায় পুলিশ। দুধ সাদা সেই ‘ভিআইপি কার’ থেকে উদ্ধার হয় এক হাজার শিশি কাশির সিরাপ। পাচারের অভিযোগে ধরা পড়ে এজারুল শেখ ও ওয়াসিম রেজা নামে দুই যুবক।

পুলিশ জানিয়েছে, এজারুল জলঙ্গির ধনিরামপুরের বাসিন্দা। ওয়াসিমের বাড়ি নদিয়ার থানারপাড়া এলাকার সোমরাজপুরে। জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘মারুতি ভ্যান বা অন্য কোনও ছোট গাড়িতে করে পাচারের প্রবণতা এই এলাকায় রয়েছে। তবে পাচারের জন্য স্করপিও-র ব্যবহারে আমরাও অবাক। এ দিন পাচারের খবরটা ঠিক সময়ে কানে এসেছিল তাই রক্ষে!’’

Advertisement

জেলা পুলিশের ওই কর্তা অবাক হলেও সীমান্তের বাসিন্দারা কিন্তু জানাচ্ছেন, পাচারের সঙ্গে গাড়ির যোগ বহু পুরনো। ‘এনফিল্ড’ কিংবা ‘রাজদূত’ একসময় সীমান্ত কাঁপাত। সিঙ্গল স্ট্রোটে স্টার্ট দেওয়া ‘ইয়ামাহা আর এক্স হানড্রেড’, কিংবা ‘হিরো হন্ডা সিডি হানড্রেড’ বাইকের আওয়াজ এখনও মনে আছে সীমান্তের। তারপরে এল আরও নতুন বাইক, অ্যাম্বাসাডারের মতো গাড়ি। তবে বদলে গেল কেতা। কোনও গাড়ির উপরে লেখা থাকত ‘প্রেস’, কোনওটায় আবার ‘পুলিশ’। সে ভুল ভাঙতেও দেরি হয়নি বিএসএফ ও পুলিশের। পাচারের অভিযোগে সে সব গাড়ির চালক কিংবা মালিক ধরা পড়েছে। আটক করা হয়েছে সেই গাড়িও।

বুধবার রাতের ওই ঘটনার পরে কাহারপাড়া সীমান্তের এক প্রৌঢ় অবশ্য বলছেন, ‘‘বড়লোকরা গাড়ির মডেল বদল করে সখে। আর সীমান্তে গাড়ি বদল হয় পুলিশ ও বিএসএফের চোখে ধুলো দিতে। আমরা মাঝেমধ্যে চমকে যেতাম এই এলাকায় ঘনঘন পুলিশ ও প্রেস লেখা গাড়ি দেখে। কখনও কখনও অ্যাম্বুল্যান্সও আসত। অ্যাম্বাসাডার দেখলেই ভাবতাম গাঁয়ে বুঝি কোনও নেতা-মন্ত্রী এল। পরে অবশ্য জানা যায় সে সবই ছিল ভুয়ো ব্যাপার।’’

এই স্করপিও সেই গাড়ি-তালিকায় যে নতুন সংযোজন তা মানছেন জেলা পুলিশের ওই কর্তাও। তাঁর কথায়, ‘‘ব্লক থেকে শুরু করে জেলার শাসক দলের অধিকাংশ নেতাই এখন স্করপিও গাড়ি পছন্দ করছেন। ফলে রাস্তায় কিংবা সীমান্তে স্করপিও দেখলে তেমন সন্দেহ করা হত না। প্রাথমিক ভাবে সেগুলি নেতাদের গাড়ি বলেই ছেড়ে দেওয়া হত। একই ভাবে একসময় অ্যাম্বাসাডারেও পাচার চলত। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল স্করপিওতে সবসময় নেতা নয়, ফেনসিডিলও যায়।’’

ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পাচারের কৌশল। শীতকে বরাবর সমঝে চলে বিএসএফ ও পুলিশ। তারাও যেমন সতর্ক থাকে, তেমনি তক্কে তক্কে থাকে পাচারকারীরাও। ঘন কুয়াশার আড়ালে সবথেকে বেশি পাচার হয় কাশির সিরাপ— ফেনসিডিল। বিএসএফের দাবি, সীমান্তে এখন গবাদি পশুর পাচার অনেকটাই কমে গিয়েছে। তবে গাঁজা কিংবা ফেনসিডিল পাচার যে চলছে সে কথাও কবুল করছে তারা। সীমান্তের এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘ফেনসিডিল পাচার করা কম ঝুঁকির। লাভও অনেক বেশি।’’ কী রকম?

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি ফেনসিডিলের দাম ৭৮ টাকা। সীমান্তের বাজারে পৌঁছনোর পরেই তার দাম একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩০-২৬০ টাকা। আর সীমান্তের ওপারে পৌঁছে গেলেই তার দাম হয়ে যায় গড়ে ৪০০-৬০০ টাকা। আর সেই কারণেই সীমান্তে এখন ফেনসিডিল পাচারের প্রবণতা বেড়ে যায়। আর স্করপিও করে বড় দাঁও মারতে চেয়েছিল ধৃত এজারুল শেখ ও ওয়াসিম রেজা। পুলিশের দাবি, ধৃত দু’জনেই জেরায় সে কথা কবুলও করেছে। আজ, শুক্রবার ধৃতদের লালবাগ আদালতে হাজির করানো হবে।

ডোমকলের এসডিপিও অমরনাথ কে বলেন, ‘‘এর আগে পাচারের অভিযোগে আমরা মারুতি ভ্যান বা ছোট গাড়ি-সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি। কিন্তু স্করপিও-র ব্যাপারটা এই প্রথম ঘটল। এ বার থেকে স্করপিওর উপরেও কড়া নজর রাখা হবে।’’

স্করপিও গাড়িতে যাতায়াত করেন জেলা তৃণমূলের সভাপতি মান্নান হোসেনও। এই ঘটনার কথা শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘সংগঠনের কাজে বহু এলাকায় যাতায়াত করতে হয়। সে ক্ষেত্রে স্করপিও বেশ আরামদায়ক ও নিরাপদ গাড়ি। সেই কারণেই আমি ও দলের অনেকেই এই গাড়ি পছন্দ করেন। কিন্তু সেটাকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা যদি এমন কাজকর্ম শুরু করে তাহলে তো মুশকিল। আমি বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ও বিএসএফের সঙ্গেও কথা বলব।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy