পর্যটক ও যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে জেলার ছ’টি ঘাটে ভাসমান জেটি তৈরি করতে চলেছে নদিয়া জেলা প্রশাসন। এই প্রকল্পের বিস্তারিত বিপোর্ট তৈরির জন্য বছর দুয়েক আগে সেচ দফতরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দিনকয়েক আগে সেই প্রকল্পের রিপোর্ট সেচ দফতর তৈরি করেছে। সম্প্রতি সেই রিপোর্টের প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে জেলাশাসক ও রাজ্যের সেচ ও পর্যটন দফতরকে।
সেচ দফতরের দাবি, ওই জেটিগুলি তৈরি করতে খরচ হবে প্রায় ১৮ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা। পর্যটন দফতর ওই অর্থ মঞ্জুর করলেই শুরু হবে জেটি তৈরির কাজ। জেলাশাসক বিজয় ভারতী বলেন, ‘‘এই ভাসমান জেটিগুলি তৈরি হলে ঘাট পারাপারে লোকজনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে যাবে। আশা করি খুব দ্রুত আমরা কাজ শুরু করতে পারব।’’
সারাটা বছর ধরেই নবদ্বীপ ও মায়াপুরে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। নিত্য প্রয়োজনে এই শহরে আসা লোকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে সমস্যা হয় বর্ষাকালে। ভরা বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠে ভাগীরথী। অথচ এই সময়েই ঝুলন ও জন্মাষ্টমীর সৌজন্যে ওই দুই শহরে তিলধারণের জায়গা থাকে না। সেই ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ভোগান্তিও।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, নবদ্বীপ-মায়াপুরের বেশ কয়েকটি ঘাটে ভাসমান জেটি রয়েছে। কিন্তু সেখানেও এই বিরাট ভিড় সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। আর নবদ্বীপ থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার পথে নবদ্বীপের আর এক ঘাটে ভাসমান জেটিই নেই। সেখানে কাজ চালাতে হয় বাঁসের তৈরি অস্থায়ী জেটি দিয়ে। জল মাড়িয়ে নড়বড়ে সেই জেটি পেরিয়ে উঠতে হয় নৌকায়। অন্যভস্ত অনেকে দুর্ঘটনার কবলেও পড়েন। শান্তিপুরের বড়বাজার ও গুপ্তিপাড়া ঘাটে জেটি থাকলেও তা নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। মায়াপুরের ফিসারি ঘাট এবং কৃষ্ণনগরের দ্বীজেন্দ্র সেতুর কাছে কোনও জেটিই নেই। এই সমস্যা নিয়ে জেলা প্রসাসনের কাছে চিঠিচাপাটিও কম হয়নি। জেলা প্রশাসনের কর্তাদের দাবি, অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে।
সেচ দফতরের এক কর্তা জানান, জল-স্তর বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের জেটির অবস্থানেরও পরিবর্তন হবে। জোয়ার-ভাটার সময় নদীর জলস্তর ওঠানামা করে। তাছাড়া বর্ষাকালে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে নদীর জলস্তর অনেকটাই বেড়ে যায়। সেই অবস্থায় সাধারণ জেটি জলের তলায় চলে যায়। নৌকা থেকে ওঠানামা করাটা খুব সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ভাসমান জেটির ক্ষেত্রে এ রকম সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ভাগীরথীর মতো জলঙ্গি নদীতেও বেশ কয়েকটি যাত্রী পারাপারের ঘাট রয়েছে। একই সমস্যা হয় সেখানেও।
জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলছেন, ‘‘এই সব অসুবিধার কথা মাথায় রেখেই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলিতে ভাসমান জেটি তৈরি করা হচ্ছে।’’ কিন্তু রিপোর্ট তৈরি করতেই যদি দু’বছর সময় লেগে যায় তাহলে কাজ শেষ করতে কতদিন লাগবে? সেচ দফতরের নদিয়া জেলার এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জয়কুমার সিংহ কবুল করছেন, ‘‘এই ধরনের জেটি তৈরির রিপোর্টের কোনও অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। ফলে রিপোর্ট তৈরি করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। তবে অর্থ অনুমোদন হয়ে গেলে আমরা দ্রুত কাজ শেষ করতে পারব।’’
প্রশাসন সূত্রে খবর, নবদ্বীপ ব্লকের মায়াপুর ফিসারি ঘাট, হুলোর ঘাট, নবদ্বীপ ঘাট, শান্তিপুরে বড়বাজার ঘাট, গুপ্তিপাড়া ঘাট এবং কৃষ্ণনগরের দ্বীজেন্দ্র সেতুর কাছে জলঙ্গী নদীর বাঁ পাড়ে ভাসমান জেটি তৈরি করা হবে। মায়াপুর ফিসারি ঘাটের ভাসমান জেটির জন্য ৬ কোটি ১২ লক্ষ টাকা, হুলোর ঘাটের জন্য ২ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা, নবদ্বীপ ঘাটের জন্য ২ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা, গুপ্তিপাড়া ঘাটের জন্য ২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা, বড়বাজার ঘাটের জন্য ২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা এবং কৃষ্ণনগরে দ্বীজেন্দ্র সেতুর কাছে জলঙ্গী নদীতে ভাসমান জেটির জন্য ২ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা খরচ হবে।
নবদ্বীপ ও হুলোর ঘাটে ভাসমান জেটি রয়েছে। তবে বারো মাসে তেরো পার্বণের শহর নবদ্বীপে বছরের বিভিন্ন সময়ে পর্যটকের আনাগোনা লেগেই থাকে। ফলে ওই ঘাট দু’টিতে মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ে। চালানো হয় অতিরিক্ত নৌকা। সেই কারণে ওই দু’টি ঘাটে অতিরিক্ত ভাসমান জেটি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ‘‘অনেকদিন ধরেই অতিরিক্ত জেটি তৈরির কথা বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছিল। সেটা বাস্তাবায়িত হয়ে গেলে সত্যিই হয়রানির দিন শেষ হবে।’’