কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া কবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তার পরেও সরাসরি পড়ুয়াদের ভর্তি নিয়েছিল নানা কলেজ। তবু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএড কলেজগুলিতে ভর্তির হার আশানুরূপ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, বিএড কলেজগুলিতে অন্তত ৪০-৪৫ শতাংশ আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের নিয়ে তৈরি ‘সেল্ফ ফিন্যান্স বিএড ফাউন্ডার অ্যাসোসিয়েশন’-এর কর্তারাও জানান, কিছু পড়ুয়া ভর্তি হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু নানা কারণে সেই চাহিদা নেই। ছাত্রাবাসগুলি কার্যত ফাঁকা পড়ে রয়েছে। তাই এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পরেও ৩০টি কলেজ কোনও পড়ুয়া ভর্তি করেনি।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরও কাউন্সেলিংয়ে বিএড কলেজগুলিতে সব আসন পূরণ করা গিয়েছিল। কিন্তু এ বার ক্লাস শুরুর তিন মাস পরেও দফায়-দফায় কাউন্সেলিংয়েও ৫০ শতাংশের বেশি পড়ুয়া ভর্তি করানো যায়নি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত হুগলির চন্দননগরে, হুগলি গভর্নমেন্ট বিএড কলেজ, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, বর্ধমানের কাজিডাঙা, কাটোয়া ও কালনায় সরকারি বিএড কলেজ রয়েছে। এই ছ’টি কলেজ ছাড়াও বর্ধমান-বাঁকুড়া-হুগলিতে মোট ৭৭টি বেসরকারি কলেজ গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএডের আসন সংখ্যা রয়েছে ৮২৫০।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তা বলেন, ‘‘গত বার কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ১০০ শতাংশ পড়ুয়াকে বিএড পাঠ্যক্রমে ভর্তি করানো হয়েছিল। তার পরেও প্রচুর পড়ু্য়া লাইনে ছিলেন। সেখানে এ বার কাউন্সেলিংয়ে ৫০ শতাংশ ভর্তি করতে নাভিশ্বাস উঠেছে। তার পরেও বেশ কিছু পড়ুয়া সরাসরি কলেজে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি আসন এখনও ফাঁকা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।’’ যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য ষোড়শীমোহন দাঁয়ের আশা, ‘‘সামনের বছর থেকে ফের বিএড পাঠ্যক্রমে ভর্তি হওয়ার চাহিদা বাড়বে।”
হঠাৎ এ বার বিএডে পড়ুয়া কমে যাওয়ার কারণ কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকদের ধারণা, গত বার বেসরকারি কলেজে এক বছরের বিএড পাঠ্যক্রমের জন্য পড়ুয়াদের দিতে হত ৪৪ হাজার টাকা। আর এ বছর থেকে এনসিটিই-র নিয়ম মেনে বিএড হয়েছে দু’বছরের। সেখানে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা পড়ুয়াদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘‘এক দিকে সময় বেশি। তার উপরে মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিতে হচ্ছে। তাই বিএড পড়ার জন্য মধ্যবিত্ত পরিবারের পড়ুয়ারা অন্তত এ বছর সে ভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে।’’ আর এক অধ্যক্ষের কথায়, ‘‘বিএড করলেই কর্মসংস্থান বাঁধা, এমন কোনও নিশ্চয়তা এখনও পর্যন্ত পড়ুয়ারা পাননি। সে কারণেই সম্ভবত দু’বছর ধরে বিএড পাঠ্যক্রমে ভর্তির ব্যাপারে উৎসাহী হচ্ছেন না।’’
এই পরিস্থিতিতে অনেক কলেজ সর্বোচ্চ ‘কোর্স ফি’ না নিয়ে ৮০-৮৫ হাজার টাকাতেও অনেক পড়ুয়াকে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছে। আবার সে কথা জানাজানি হতেই বর্ধমানের নবাবহাট, গলসির বিএড কলেজে বেশি টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়া পড়ুয়ারা দফায়-দফায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। টাকা কমানোর দাবিতে অধ্যক্ষকে রাতভর ঘেরাও করার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়াও পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল, এনসিটিই-র নিয়ম মেনে সব সময়ের শিক্ষক নিয়োগ-সহ নানা নিয়ম মানছেন না কলেজ কর্তৃপক্ষ। সাত জন শিক্ষকের বদলে তিন-চার জন দিয়ে কলেজ চালানোর প্রবণতা রয়েছে। সব কিছু জেনেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উদাসীন বলে ওই পড়ুয়াদের দাবি। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ এ সব মেটানোর আশ্বাস দিয়ে বিক্ষোভ থামিয়েছেন।
তবে পাঠ্যক্রমের সময় ও টাকার অঙ্ক বেড়ে যাওয়ার জন্য পড়ুয়াদের মধ্যে বিএড পড়ার চাহিদা কমে গিয়েছে বলে মানতে রাজি নয় বিএড কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের সংগঠন ‘সেল্ফ ফিনান্স বিএড ফাউন্ডার অ্যাসোসিয়েশন’। ওই সংগঠনের জেলা সম্পাদক, আসানসোলের বাসিন্দা সুপ্রিয় দাসের বক্তব্য, ‘‘কী নিয়মে বিএডে ভর্তি করানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সেলিং করতে দেরি করে। তার ফলে অনেক পড়ুয়া অন্য জায়গায় ভর্তি হয়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া প্রচুর বিএড কলেজ তৈরি হওয়ায় পড়ুয়াদের ভর্তি নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়নি।’’ তবে সে কথা মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ষোড়শীমোহনবাবুর দাবি, ‘‘আমাদের ধারণা, পড়ুয়ার তুলনায় বিএড আসন সংখ্যা কম।’’
তবে তার পরেও ফাঁকাই পড়ে বিএডের আসন।