প্রায় হাজার বছর আগে বঙ্গদেশের ‘প্রাকৃত পিঙ্গল’ সাহিত্যে পাওয়া যায়, গৃহিণী যার কলাপাতায় গরম ভাতে দিতেন একটু ঘি আর চুনো মাছ ভাজা, সেই হল ভাগ্যবান। ঘি আজও বাঙালি সংসারে স্বাদ, শুদ্ধতা আর সমৃদ্ধির প্রতীক। সয়াবিন, সূর্যমুখীর তেলের যুগেও ঘিয়ের আদর কমেনি বাঙালি হেঁসেলে। ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাতে কী খিচুড়ির সঙ্গে ঘি তো চাই-ই, তেমনই যে কোনও আমিষ-নিরামিষ খাবারে অমৃতের স্বাদ আনতে একটু ঘি-ই যথেষ্ট। অবাঙালি কেতায় মিঠাই, লাড্ডু, হালুয়া বানাতে হলেও চাই ঘি।
তবে বাঙালির ঘি মানেই গাওয়া ঘি। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে মোষের দুধের ‘ভইসা ঘি’ প্রচলিত থাকলেও, গরুর দুধের ঘি না হলে মন ওঠেনি বাঙালির। একটা সময় ছিল, যখন ঘি তৈরি হত বাড়িতেই। মেদিনীপুরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব লক্ষ্মী সাউয়ের কথায়, “দুধের সর তুলে রাখা হত। কিছু দিন পরে সর থেকে ঘোল হত। পরে তা থেকে ঘি হত।’’ পরিশ্রমের কাজ কেউ করতে চায় না। ঘি কিনেই কাজ চালায়। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘ঘরের ঘি-এর সঙ্গে বাজারের ঘি-এর স্বাদ-গন্ধ মেলে না।’’
আগে চেনাশোনা গোয়ালার থেকে ঘি কেনার চল ছিল গৃহস্থ বাড়িতে। বাজারে নানা নামীদামি ব্র্যান্ডের ঘি এসে যাওয়ায় দিশি ঘিয়েরও দিন গিয়েছে। খড়্গপুর রেল শহরের ধানসিংহ ময়দান লাগোয়া এলাকায় আগে ১৫টি গরু-মোষের খাটাল ছিল। এখন মাত্র তিনটে খাটাল রয়েছে। খাটাল-মালিক সনঝ্ যাদব বলেন, “খড়্গপুরে আমাদের তিন পুরুষের দুধের ব্যবসা। বাবা-ঠাকুর্দার আমলে প্রচুর পরিমাণে ঘি বিক্রি হত। কিন্তু এখন বাজারে নানা নামী কোম্পানির ঘি চলে এসেছে। তার দাম আমাদের তৈরি দেশি ঘিয়ের তুলনায় যথেষ্ট কম। লোকসানের জেরে ঘি ব্যবসা তুলে দিয়েছি।” মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার দুধ ব্যবসায়ী খোকন ঘোষের আক্ষেপ, “বছর পাঁচেক আগেও দেশি ঘিয়ের চাহিদা ছিল। সেই বাজারটা দখল করে নিয়েছে নামী প্রস্তুতকারক সংস্থার ঘি।” বাঁকুড়ার বলরামপুরের এক জন দুধ ব্যবসায়ী মঙ্গল ঘোষও বললেন, ‘‘আগে আমাদের তৈরি ঘিয়ের প্রচুর চাহিদা ছিল। এখন কেবল নিয়মিত যারা দুধ কেনেন, তাঁদের ফরমায়েশ মতো ঘি বানাই।” বাঁকুড়ায় এ রকম খাটালের গাওয়া ঘি-এর প্রতি কেজি দর ৮০০ টাকা। ভইসা ঘি ৫০০ টাকা কিলো। মিষ্টির দোকানগুলোতেও ঘি বিক্রি হত। মেদিনীপুর শহরের মিষ্টি ব্যবসায়ী গোবিন্দ দাস বলেন, “তখন দোকানে তৈরি ঘিয়ের একটা বাজার ছিল। তবে এখন আর সেটা নেই।”
বাঁকুড়ার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী প্রশান্ত বরাট অবশ্য গোয়ালাদের তৈরি ঘি দোকানে রাখেন না। তিনি বললেন, ‘‘খাটালের ঘিয়ের গুণগত মান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এই জন্য নামী ব্র্যান্ডের ঘি রাখি। ৬০০-৭০০ টাকা কেজি দরে ‘ব্র্যান্ডেড ঘি’ পাওয়া যায়।” বনগাঁর ট’বাজারের মুদির দোকানের মালিক প্রশান্তকুমার সাধু জানালেন ব্র্যান্ডেড ঘিয়ের কিলোপ্রতি দর —লক্ষ্মী ঘি ৫২০ টাকা, ঝরনা ঘি ৪৪০ টাকা, গোল্ডেন ঘি ৪১০ টাকা, লোকনাথ ঘি ৩৪০ টাকা।
মুর্শিদাবাদ জেলায় আবার বেশি চলে সরকারি ঘি। ‘দি ভাগীরথী কো-অপারেটিভ মিল্ক প্রোডিউসার্স ইউনিয়ন’ নামে রাজ্য সরকারের ওই প্রকল্পে ঘি তৈরি ও বিক্রি, দু’টোই করা হয়। প্রতি কেজির দাম ৫০০ টাকা। একশো গ্রাম থেকে এক কেজি, নানা ওজনে ঘি পাওয়া যায়। ভাগীরথী সমবায়ের তৈরি ঘি মুর্শিদাবাদ জেলার ৪০ শতাংশ বাজার দখল করে নিয়েছে বলে উত্পাদক সংস্থাটির দাবি।
দেশি ঘিয়ের উপর থেকে ভরসা চলে যাওয়ার জন্য দুধ ব্যবসায়ীদের অসাধুতাকেই দায়ী করেন ক্রেতারা। দশকর্মা ভাণ্ডারের দোকানগুলিতে শিশিতে ঘি বলে যেগুলি বিক্রি হয়, সেগুলি আদপে ঘি নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘি তৈরির পর অবশিষ্ট খাঁকির সঙ্গে পাম তেল মিশিয়ে সুগন্ধী দিয়ে ৩০০ টাকা কেজি দরে চালানো হচ্ছে। বিষ্ণুপুরের বাপি চক্রবর্তীর পারিবারিক পেশা যজমানি। পুজো, বিয়ে ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে হোমে ঘি লাগে। বাপিবাবুর বক্তব্য, “এক সময় হোমে খাঁটি গাওয়া ঘি ঢালা হত। হোমের সুঘ্রাণে চারিদিক ম-ম করত। এখন বেশিরভাগ বাড়িতে হোমের জন্য দশকর্মা ভাণ্ডারের ছোট ঘিয়ের শিশি এগিয়ে দেওয়া হয়।” দেবতাকেও ঘি-গন্ধী তরলে তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। (সহায়তা: দেবমাল্য বাগচী, রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বরুণ দে, সেবাব্রত মুখোপাধ্যায় ও সামসুদ্দিন বিশ্বাস)