আবাসন নির্মাণের জন্য পুকুর ভরাটের কথা শোনাই যায়। তা বলে বোল্ডার ফেলে একেবারে গঙ্গা ভরাট!
উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী হাইস্কুলের পাশে জিটি রোডের ধারে আটতলা আবাসন নির্মাণের জন্য বোল্ডার ফেলে সরাসরি গঙ্গা বোজানোর অভিযোগ উঠল প্রোমোটার-চক্রের বিরুদ্ধে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা উত্তরপাড়া পুরসভার নজর এড়িয়ে কী ভাবে ওই কাজ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।
উত্তরপাড়ায় আবাসনের বাজার রীতিমতো ভাল। গত কয়েক বছরে আবাসন তৈরির জন্য ভদ্রকালীতেই গঙ্গার একটি খাঁড়িও বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। খাঁড়ি লাগোয়া ইটভাটা তুলে দিয়ে সেখানে বেশ কয়েকটি আবাসন নির্মাণের কাজও এখন শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা আপত্তি তুললেও তা ধোপে টেঁকেনি।
গঙ্গার গা ঘেঁষে গত বছর থেকে জোর কদমে আটতলা আবাসনটির নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। আবাসনের মাটির নীচের দু’টি তল হয়েছে পার্কিংয়ের জন্য। আবার দু’-তিন তলায় গাড়ি ওঠার জন্য বিশেষ ‘র্যাম্প’ তৈরি করা হয়েছে। বোল্ডার, জমা সিমেন্ট এবং কংক্রিটের বড় বড় থাম এনে গঙ্গার পাড় লাগোয়া জমি বেশ কয়েক ফুট বোজানো হয়েছে। দু’-আড়াই ফুট ব্যাসার্ধের শ’য়ে শ’য়ে বোল্ডার গঙ্গাকে প্রায় ৪০ ফুট সরিয়ে দিয়েছে তার আগের জায়গা থেকে। ওই প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে আসা মুর্শিদাবাদের সুতির এক যুবক বলেন, ‘‘মাস কয়েক ধরে ট্রাকে পাথর এনে গঙ্গায় ফেলা হচ্ছে।”
কিন্তু সাধারণ মানুষ যাতে সে সব দেখতে না পান, সে জন্য সেখানে আড়াল করে অন্তত দশ ফুটের পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়েছে।
কেন ভরাট করা হচ্ছে গঙ্গার পাড় লাগোয়া জমি?
এ ব্যাপারে নির্মাণ সংস্থার তরফে অজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওখানে বোল্ডার ফেলে গঙ্গার ভাঙন রোধ করছি। যে কাজ সেচ দফতরের করার কথা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সেই কাজ করছি। এ জন্য অনুমতি লাগবে কেন? আমাদের তো প্রশংসা পাওয়া উচিত।’’
এলাকাবাসীর অবশ্য অভিমত, ভদ্রকালীর ওই এলাকায় বাঁকের মুখে গঙ্গা ভাঙনপ্রবণ। ভাঙনে লাগোয়া ভদ্রকালী-শিবতলা শ্মশানগঙ্গায় প্রায় তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ দিকে, ভদ্রকালীর ওই এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম শুরুই হচ্ছে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা থেকে। কিন্তু ভাঙনপ্রবণ এলাকা ফ্ল্যাট বিক্রির অন্তরায় হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে নির্মাণকারী সংস্থা গঙ্গা বোজাচ্ছে। কেউ কেউ অবশ্য মনে করছেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীও গঙ্গা থেকে সাদা বালি তোলার জন্য প্রোমোটারদের সঙ্গে আঁতাঁত করেছে। বোজানো অংশের সৌজন্যে তাদের বালি তোলার কাজ সহজ হয়েছে।
গঙ্গা বাঁচাতে এ রাজ্যে কলকাতা হাইকোর্ট নিযুক্ত বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি পরিবেশবিদদের নিয়ে একটি কমিটি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেই কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের ‘ক্লিন গঙ্গা মিশন’ প্রকল্পের অধিকর্তা হরিহর মিশ্র অবশ্য বলেন, “অত্যন্ত গর্হিত কাজ চলছে উত্তরপাড়ার গঙ্গায়। আমি দ্রুত রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠাব। ওখানে গঙ্গা রক্ষায় যা করার, কেন্দ্র করবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নদী-আইন বলছে, জোয়ার-ভাটা খেলে এমন নদীর জোয়ারের জল যত দূর পৌঁছয়, তার থেকে অন্তত ৪৭ মিটার জায়গা ছেড়ে নির্মাণ করা যাবে। ভদ্রকালীর ওই নির্মাণে সে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান ও নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র বলেন, ‘‘স্থানীয় পুরসভা কী করে ওই নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে জানি না। গঙ্গার পাড়ে ২০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের কোনও নির্মাণ হলে কেন্দ্র সরকারের একটি কমিটি মারফত আমরা জানতে পারলে ব্যবস্থা নিই। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরসভারই দেখার কথা।’’
বছর দু’য়েক আগে এই জেলারই চন্দননগরের গঙ্গা তীরবর্তী হাটখোলা এলাকায় দু’টি আবাসনে ফাটল ধরেছিল। আবাসনের কিছুটা ভেঙেও পড়ে। অভিযোগ ছিল, গঙ্গা থেকে অবৈধ ভাবে বালি তোলার ফলে ভাঙনের জেরে ওই ফাটল। সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যেপাধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করে যান। সেই প্রসঙ্গ তুলে কল্যাণবাবু জানান, সেই সময় সেচ দফতর বলেছিল, এ ধরনের কোনও নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে তা কী ভাবে হল, পুরসভাই বলতে পারবে।
উত্তরপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান দিলীপ যাদব দাবি করেছেন, ওই নির্মাণের অনুমোদনের সময়ে বর্তমান পুরবোর্ড ক্ষমতায় ছিল না। তিনি বলেন, ‘‘কী ভাবে কী হয়েছে, দেখা হচ্ছে। উত্তরপাড়ায় বেআইনি নির্মাণ রুখতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গঙ্গা লাগোয়া ওই নির্মাণের ক্ষেত্রে পোর্ট ট্রাস্টের কাছে নির্মাণকারী সংস্থা আবেদন করেছে বলে জেনেছি। বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে,তা জানতে হবে।’’
কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের প্রশ্ন, প্রশাসনিক ‘দীর্ঘসূত্রিতা’র সুযোগে গঙ্গাকেই না বুজিয়ে ফেলা হয়!
কতদিনে হবে? মুক্তি, ওই তার ছিঁড়ে দেয়াল ডিঙিয়ে ভেঙে নয় কোনকিছু, শক্তি ভেঙে নয় সম্মুখে সর্বস্ব বাধা–তাও ভেঙে নয় শুধু ডানা পেলে উড়ে অথবা ডিঙিয়ে ছিঁচকে কাজ, যা করে নির্বোধ চোর তাই করে, শুধু তাই করে আর কিছু নয় আর কিছু করতেও পারে না।