ঝড়খালিতে মুখ্যমন্ত্রীর সাধের পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন তোেল কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রক। সেই আপত্তিতে সিলমোহর দিতে চলেছে কোস্টাল রেগুলেশন জোন (সিআরজেড)-এর সাম্প্রতিক একটি বিজ্ঞপ্তি।
যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবনের বাদাবন লাগোয়া এলাকায় পর্যটন তো দূরের কথা উপকূল-বিধির আওতা-নির্দিষ্ট এলাকায় জনবসতও কাম্য নয়। যা ঝড়খালির হবু ‘ট্যুরিস্ট হাব’ নয়, পর্যটন মানচিত্রে সুন্দরবনের পরিচিত বিজ্ঞাপন সজনেখালির উপরে প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্তত পনেরোটি ব্লকে জনবসতের উপরেও ঝুলে গিয়েছে উচ্ছেদের ভ্রূকুটি।
কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রকের কাছে তাই চিঠি দিয়ে রাজ্য সরকারের আর্জি—ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলির উপরে যেন উপকূল আইন কার্যকর করা না হয়। সিআরজেড-এর বিশেষ সচিব শশী শেখরের কাছে ওই আবেদন জানিয়ে চিঠি দেন রাজ্যের পরিবেশ সচিব চন্দন সাহা। চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, সুন্দরবনের ওই বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন জনবসতিপূর্ণ। এলাকাটি সিআরজেড-এর আওতায় এলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের জীবনধারণের জন্য রুজির ন্যূনতম উপায় হারাবেন। তাঁর দাবি, এলাকাটি উপকূলবিধির শাসনে পড়লে ক্ষুণ্ণ হবে সুন্দরবন জীব পরিমণ্ডল বা বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের প্রাথমিক শর্তগুলিও। চন্দনবাবু অবশ্য এ ব্যাপারে ‘নো কমেন্টস’ বলে দায় এড়িয়েছেন। তবে সিআরজেড-এর সচিব শশী শেখর বলেন, ‘‘যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলেই নেওয়া হবে।’’
সুন্দরবন জীব পরিমণ্ডলের আওতায় পড়ে দুই ২৪ পরগনার ১৯টি ব্লকের মধ্যে অন্তত ১৫টি। উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ ওই এলাকা বরাবর বিস্তৃত ড্যামপিয়ার-হজেস লাইন। যা এক অর্থে উপকূল-বিধির সীমানা নির্দিষ্ট করে। বিশেষজ্ঞরা জানান, ওই লাইন আদতে একটি কাল্পনিক রেখা যা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৫টি ব্লক ছুঁয়ে গিয়েছে। সিআরজেড-এর এক শীর্ষ কর্তা বলেন, ‘‘নদী মোহনায় সিআরজেড তার এলাকা নির্দিষ্ট করে জোয়ার-ভাঁটার নিরিখে। সুন্দরবনের মাঝ বরাবর বিস্তৃত কাল্পনিক রেখা-নির্দিষ্ট এলাকায় অবিরাম চলে জোয়ার-ভাঁটা। স্বাভাবিক ভাবে এই সমস্ত ব্লক উপকূলবিধির আওতায় পড়বে।’’ ঘটনাচক্রে ওই ব্লকগুলি সুন্দরবনের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাড়োয়া, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ এবং সন্দেশখালি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং, গোসাবা, জয়নগর, মথুরাপুর, সাগর, কুলতলি, পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপ এবং নামখানা ব্লক ওই এলাকাভুক্ত। যার জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ লক্ষ। বসতের পাশাপাশি ওই ব্লকগুলিতে ড্যামপিয়ার-হজেস লাইন বরাবর রয়েছে বেশ কিছু স্কুল-কলেজ। রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি দফতর এমনকী স্থানীয় ত্রাণ-শিবির।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ঝড়খালি-পর্যটন আবাস গড়ে তোলার সময়েই এ ব্যাপারে তাঁকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন এক পরিবেশবিদ। তিনি বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর সুরে সুর না মেলালে কোনও পরামর্শই তিনি গ্রাহ্য করেন না। ওঁকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়েছিলাম। গ্রাহ্য করেননি।’’
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই কবুল করেছেন রাতারাতি ওই ১৫টি ব্লকে উপকূল-বিধি কার্যকর করতে যাওয়া ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তৈরি করে দেওয়া। তাঁদেরই এক জনের দাবি, ‘‘পরিবেশ আইনের স্বার্থে ৩৮ লক্ষ মানুষকে ঘর-ছাড়া করে দেওয়া তো মুখের কথা নয়, ওই গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের দায় কে নেবে?’’
এই যুক্তিই এখন রাজ্য সরকারের কাছে ‘শেষ ভরসা’। তাই দিল্লির সরকারের কাছে ওই আবেদনপত্রে এই ব্যাপারেই জোর দেওয়া হয়েছে।
উত্তরের অপেক্ষায় আপাতত দিন জপছে সুন্দরবনের মানুষ।