ফসফেট ও পটাশঘটিত সার বিনিয়ন্ত্রণের ফলে দাম হয়েছে আকাশ ছোঁওয়া। অন্য দিকে ইউরিয়া সার সরকারের ব্যাপক ভর্তুকির কল্যাণে নুনের থেকেও সস্তা। এই প্রেক্ষিতে কৃষক ফসলের ফলন বৃদ্ধির আশায় ফসফেট, পটাশ ও অন্যান্য গৌণ এবং অনুখাদ্যগুলির সঙ্গে কোনও সাযুজ্য বা ভারসাম্য না রেখে শুধু সস্তার ইউরিয়া সার ব্যবহারে মত্ত। যার জেরে মাটির উৎপাদনশীলতা কমছে, ভূগর্ভস্থ জলের দূষণ বাড়ছে, পরিবেশ ক্রমে উষ্ণ হচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে চাষে নিম কোটেড ইউরিয়ার ব্যবহার নিয়ে এসেছে নতুন আশার আলো।
ইউরিয়ার প্রয়োজন
বীজ থেকে ফসলের বেড়ে ওঠা ও জীবনচক্র সম্পন্ন করতে ১৬টি খাদ্য উপাদান জরুরি। যার মধ্যে নাইট্রোজেন হল অন্যতম মুখ্য উপাদান। এটি উদ্ভিদের পাতা ও কাণ্ডের সবুজ অংশ—ক্লোরোফিল তৈরি করে শর্করা উৎপাদন করে এবং প্রোটিন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এক কথায় নাইট্রোজেন হল ফসলের বৃদ্ধি ও অধিক উৎপাদনের প্রধান হাতিয়ার। আর এই নাইট্রোজেন পোষক তত্ত্বের প্রধান ও সস্তা উৎস হল ইউরিয়া সার। শতকরা ৪৬% ভাগ নাইট্রোজেন সরবরাহের পাশাপাশি ইউরিয়ার বিশেষত্ব হল জলে সহজে গুলে যায় এবং ননপোলার বা মেরুহীন হওয়ায় অন্যান্য সার এমনকী কীটনাশকের সঙ্গেও মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়।
প্রয়োগের পরে
ইউরিয়া মাটিতে উপস্থিত অসংখ্য উপকারী অনুজীব নিঃসৃত ইউরিয়েজ উৎসেচকের মাধ্যমে অ্যামোনিয়াতে ভাঙে। যা পরে নাইট্রোসোমোনাস ও নাইট্রোব্যাকটর জীবাণুর সহযোগিতায় নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রেটে রূপান্তরিত হয়। ফসল যেমন অ্যামোনিয়াম এবং নাইট্রেট আকারে নাইট্রোজেন নেয়, তেমনই বেশ খানিকটা অপচয় হয় উদ্বায়ী অ্যামোনিয়া গ্যাস আকারে। বাকিটা বিজারিত হয়ে নষ্ট হয় নাইট্রোজেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের গ্যাস আকারে।
অপচয়ে ক্ষতি
সহজে জলে গুলে যায বলে ইউরিয়া মাটিতে প্রয়োগ করার পর উঁচু ঢাল থেকে নিচু ঢাল বরাবর জলের সঙ্গে ধুয়ে চলে যায় বা মাটির উঁচু অংশ থেকে নীচে চুঁইয়ে পড়ে। এছাড়াও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বায়বীয় আকারে উবে দ্রুত নষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে—স্থান, ফসল ও জলবায়ুর সাপেক্ষে ব্যবহৃত ইউরিয়ার মাত্র ৩০-৫০% গাছ নেয়। বাকিটা নষ্ট হয়। এই নষ্ট হওয়া ইউরিয়া কেবল কৃষকের আর্থিক ক্ষতি করে না— মাটি, ভূগর্ভস্থ জল ও বায়ুমণ্ডলের ক্ষতি করে। ভূগর্ভস্থ জলে নাইট্রেট মিশে পানীয় জল দূষিত হয় (মানুষ ও গবাদি পশুর লিভার, কিডনি সংক্রান্ত রোগ বাড়ার জন্য দায়ী)। আবার নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমণের জন্য ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা যেমন বাড়ে, তেমনই অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ত্বকে ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ে।
নিম কোটেডে সুফল
সাধারণ ইউরিয়া সারের এই ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই এড়ানো যেতে পারে নিম কোটেড ইউরিয়ার প্রচলনে। নিম বীজ থেকে নিষ্কাশিত অ্যাজাডিরাকটিন সমৃদ্ধ ইমালশানের প্রলেপ ইউরিয়া দানায় সংযুক্ত করে তৈরি হওয়া নিম কোটেড ইউরিয়া মাটিতে প্রয়োগ করলে নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়া ধীর গতিতে হয়। কারণ নাইট্রিফিকেশন ত্বরান্বিতকারী জীবাণুগুলো এতে হীনবল হয়ে পরে। ফলে ইউরিয়া দানা ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে। ভারতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থা (IARI) পুষার বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন নিম কোটেড ইউরিয়া কমপক্ষে ১০-১৫ শতাংশ বেশী কার্যকরী এবং সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় গড়ে ৬-১২ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। নাইট্রোজেন সাশ্রয়ের পাশাপাশি ফসলের রোগ পোকা প্রতিরোধেও নিম কোটেড ইউরিয়ার বিশেষ গুণ আছে।
ভর্তুকি কমে সাশ্রয়
ভারত সরকার সবথেকে বেশি ভর্তুকি দেয় সারের উপর। অথচ এই মুল্যবান ভর্তুকির বেশ খানিকটা নষ্ট হচ্ছে। কারণ ভর্তুকির টাকায় ইউরিয়া কিনে ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য শিল্পে —পশু খাবার, প্লাস্টিক, প্লাইউড, কসমেটিক্স শিল্পে। নিম কোটেড ইউরিয়া কিন্তু এই অন্য শিল্পগুলিতে ব্যবহার করা যাবে না।
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ ইউরিয়ার সরবরাহ বন্ধ করে শতকরা ১০০ শতাংশ নিম কোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে চলেছে, যা হতে পারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকারের হিসাব মতো প্রায় ৭০০০ কোটি টাকার সাশ্রয় হবে এতে। নিম যুক্তকরণের জন্য কৃষককে কেবল মাত্র ৫ শতাংশ অতিরিক্ত দাম দিতে হবে যা অনায়াসে মেটানো যাবে ১০ শতাংশ কম ইউরিয়া ব্যবহার করে।
লেখক: মুখ্য আঞ্চলিক অধিকর্তা, ইফকো।