মাধ্যমিকে পাশের হারের এগিয়ে ছাত্রীরা। অথচ হাই মাদ্রাসায় পাশের হারে তারা পিছিয়ে। এ বারও সেই ছবি।
এ বছর মাধ্যমিকে ৮৯ শতাংশ ছাত্রী পাশ করেছে। ছাত্রদের পাশের হার ৮৬ শতাংশ। অন্য দিকে, হাই মাদ্রাসার পরীক্ষায় পাশের হারে তারা অনেকটা পিছিয়ে। এ বছর ছাত্রদের পাশের হার ৮৫ শতাংশ, মেয়েদের ৭৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে ছাত্রদের পাশের হার ছিল ৮৩ শতাংশ, মেয়েদের ৭৫ শতাংশ। বোঝা যাচ্ছে, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পাশের হারে ফারাকটা প্রায় একই থেকে যাচ্ছে।
মেধা তালিকাতেও এই ফারাকটা স্পষ্ট। হাই মাদ্রাসার মেধা তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে রয়েছে মাত্র একজন ছাত্রী। অথচ মাধ্যমিকে নম্বরের নিরিখে প্রথম ১০টি স্থান পেয়েছে যে ৪৭জন পরীক্ষার্থী, তাদের ১১জন মেয়ে। অর্থাৎ হাই মাদ্রাসার মেধা তালিকায় মেয়েরা ১০ শতাংশ, মাধ্যমিকে ২৩ শতাংশেরও বেশি।
অথচ মেয়েরা আগের চাইতে বেশি সংখ্যায় মাদ্রাসামুখী হচ্ছে। ২০১৪ সালে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় বসেছিল ৪৩ হাজার পড়ুয়া। তার মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার। এ বার পরীক্ষার্থী ছিল ৪৬ হাজার, ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার।
সংখ্যা বাড়লেও ছাত্রীদের পাশের হার বাড়ছে না কেন? শিক্ষাবিদ মিরাতুন নাহার বলেন, ‘‘পড়াশোনার ক্ষেত্রে এখনও মেয়েরা পরিবারের থেকে সহায়তা পায় না। অনেক ক্ষেত্রে যে মেয়ে একটু বড় হলেই তার বিয়ে নিয়ে কথা শুরু হয়ে যায়, সেটাও তার মনে একটা চাপ তৈরি করে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তা বলতে পারি।’’
মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সচিব সৈয়দ নুরুস সালাম জানাচ্ছেন, গ্রামের আশপাশে হাই স্কুল থাকলেও মুসলিম মেয়েদের সেখানে পাঠাতে পরিবার দ্বিধা করে। তাই ছেলেরা স্কুলে গেলেও, মেয়েরা মাদ্রাসায় যায়। তাই মাদ্রাসায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি।
তাছাড়া মুসলিম সমাজের উদ্যোগে রাজ্যে একশোরও বেশি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলির অনেক শাখাতেই মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা নেই। তাই মেয়েরা বাড়ির আশপাশের কোনও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, পরিবার যদি ১০ বছর মেয়েদের পড়ার সুযোগ দেয়, তাহলে ভাল ফল করার সুযোগ দিচ্ছে না কেন?
মহম্মদ আনসার আলি ডোমকলের সাহাদিয়ার হাই মাদ্রাসার শিক্ষক এবং রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সংগঠনের সহ-সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘‘এর মূল কারণ, মেয়েদের পড়াশোনার যে সব উৎসাহবর্ধক প্রকল্প চালু করা হয়েছে, তাতে মেয়েদের পরিবার তাদের পাঠাচ্ছে মাদ্রাসায়। সাইকেল, বালা, কন্যাশ্রী প্রকল্পের টাকা, এ সব পাওয়ার জন্য মেয়েরা স্কুলে থেকে যাচ্ছে। তাই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাটা বাড়ছে। কিন্তু মেয়েদের বাড়িতে পড়াশোনা তৈরি করার সুযোগ তৈরিতে এখনও পরিবার তেমন আগ্রহী নয়।’’
আনসার আলি জানান, বছর চারেক আগেও হাই মাদ্রাসায় মেয়েদের পাশের হারই বেশি ছিল। সম্প্রতি তা কমে আসছে, তা বেশি মেয়ে পরীক্ষায় বসার কারণেই। যে মেয়েরা ফেল করেছে, তাদের অধিকাংশই আগে দশম শ্রেণি অবধি পড়ত না। এখন তা পড়ছে।
সরকারি প্রকল্পগুলির জন্য যে বহু মেয়ে স্কুলের শেষ ধাপ অবধি এগোচ্ছে, তা স্বীকার করে ওই সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি সৈয়দ নুরে খোদা বলেন, ‘‘স্কুলে বা মাদ্রাসায় মেয়েদের পাঠালেও, গ্রামের মুসলিম পরিবারের মেয়েদের এখনও বাড়ির কাজের জন্য বেশি ব্যবহার করা হয়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবে, তাদের পড়ানোর দরকার নেই, এই চিন্তাটা থেকেই গিয়েছে। তাই দেখা যায়, মেয়েটি স্কুলে যাচ্ছে আসছে, কিন্তু বাড়িতে পড়ার তেমন সুযোগ পাচ্ছে না। ভাইয়ের টিউটর থাকলেও মেয়েটির বাড়িতে কোনও টিউটর নেই।’’ মাধ্যমিক অবধি পড়লে বিয়ে হতে সুবিধে, এই চিন্তা থেকেও অনেকে মেয়েদের শেষ অবধি পড়ান, বলেন তিনি।
নদিয়ার চাপড়ার একটি হাই মাদ্রাসার ইংরেজির শিক্ষক আবুল হোসেন বিশ্বাসও বলেন, ‘‘অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মাদ্রাসায় প্রচুর মেয়ে পড়তে আসে। কিন্তু অনেককে বাড়ির কাজ সেরে তাড়াহুড়ো করে মাদ্রাসায় আসতে হয়। বাড়ি ফিরে নানা কাজে পড়াশোনা করার সেভাবে সময় পায় না তারা। পরিবারের যত্ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্যই তারা ভাল ফল করতে পারছে না।’’
এই সমস্ত সমস্যা কাটাতে অভিভাবকদের নিয়ে বৈঠক করছেন মহম্মদ আনসার আলি। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘শিক্ষিত মেয়েদের জীবনে কী কী সুযোগ আছে, তা বোঝানোর চেষ্টা করছি তাঁদের।’’