তখন সকাল হলেই এক কাপ দুধ- ছাড়া চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে চলে যেতাম টিউশন পড়াতে। আমাদের দূর শহরতলিতে তখনও ছিল বেশ কিছু ইটের রাস্তা। রাস্তার মোড়ে ছিল একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। এর পাশে যে একটা রাধাচূড়া লাগাতে হয়, সেটা বোধহয় কেউ খেয়াল করেনি। আজ অবশ্য আমাদের ইটের গলি কংক্রিটের, মিশেছে পিচের রাস্তার সঙ্গে, কিন্তু গাছটা আর নেই।
একদিন সকালবেলার টিউশন সেরে ফিরছি, আবার বের হতে হবে বিকেলে। বাড়ির সামনের সবুজ রঙের ছোট্ট লেটার বক্সটা খুলে দেখি, খাম বা বুকপোস্ট কিচ্ছু না, রয়েছে খাতার পাতা ছেঁড়া একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ। কিচ্ছু লেখা নেই। অবাক হয়ে কাগজটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকি। কেউ হয়ত মজা করে কাগজটা লেটার বক্সে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বেশ একটা রহস্যময় ব্যাপার। সারাদিন মনটা পড়ে থাকে ওই দিকে। কে মজা করল?
কিন্তু মজা নয়। খুব সিরিয়াস! সে দিনই সন্ধের মুখে আবার টিউশনে বেরোচ্ছি, গলির মোড়ে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছাকাছি পাড়ার এক কাকিমা আর তাঁর বার্বি ডলের মতো মেয়ে। কী যেন ওর নামটা? বছর চারেক বয়েস হবে। আমাকে দেখে কাকিমা ওকে বললেন, বল। বাপিদাকে এ বার বল?
ও কিচ্ছু বলল না। বোধহয় লজ্জা পেয়েছে।
কাকিমা আবার বললেন, তবে যে বলছিলি বাপিদার বাড়ি চলো—
এ বার ও মুখ তুলে বলল, বাপিদা আমার চিঠি পেয়েছ?
বুঝতে পারলাম সাদা কাগজের রহস্য। বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি। এ বার যখন চিঠি লিখবি, সাদা কাগজ নয়, কিছু লিখে পাঠাবি।
কাকিমা হেসে বললেন, তোমাদের গেটের সামনে ওই যে লেটার বক্সটা, ওটা নিয়ে মেয়ের খুব কৌতূহল। ওকে আমি উঁচু করে তুলে ধরেছিলাম। নিজেই কাগজটা লেটার বক্সে ফেলেছে।
এর পর থেকে মাঝে মাঝেই ওর চিঠি পেতাম। কখনও অ আ ক খ কিংবা এ বি সি ডি লেখা। কখনও শিশুর হাতে আঁকা কোনও ছবি। মাছ, গাছপালা, দোতলা বাস— কত কিছুই আঁকার চেষ্টা করেছে আমার ছোট্ট বন্ধু। নার্সারিতে ভর্তি হয়েছে এখন, স্কুলের গাড়িতে যায় আসে।
রবিবার আমি পড়াতে যেতাম না। একটা দিন নিজের জন্য রাখতাম। ছেলেবেলায় আমরা কাকিমাদের বাড়ি গেছি অনেক বার। ইদানীং সময় পাই না তো, যাওয়া হয় না কোত্থাও। ফ্রি-ল্যান্স লেখা আর ফ্রি-ল্যান্স মাস্টারি করা কত কষ্টের কাজ, যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারাই শুধু বোঝে! টিউশনের শেষ মাসের মাইনেটা পাওয়া যায় না অনেক সময়, লেখার টাকা পাঠাতে ভুলে যান অনেক কাগজের অ্যাকাউন্টেট! কী আর করা যাবে, চাইতে পারি না। এক রবিবার মায়ের সঙ্গে এল আমার ‘বন্ধু’। এ বার আর লজ্জা নেই, স্মার্টলি চলে এল একচিলতে ঘরে।
বাপিদা, তুমি তো কই চিঠির উত্তর দিলে না! আমিও স্মার্টলি বললাম, দেবো, দেবো, সব ক’টার উত্তর এক সঙ্গে দেবো।
আমি অনেক রাইমস জানি, শুনবে? বাংলা-ইংরেজি দু’তিনটে কবিতা শুনিয়ে দিল। হাম্পটি ডাম্পটি, টুইঙ্কিল টুইঙ্কিল, আমাদের ছোট নদী।
বাঃ।
এ বার তুমি বলো!
বলতেই হল। আবোল তাবোলের কবিতা। বুঝিয়েও দিতে হল ওকে। তার পর থেকে মাঝে মাঝেই রবিবারে চলে আসত, কবিতা বলত। ছবি এঁকে দিত আমার খাতায়।
আজ আমার প্রতিবেশী বন্ধু এম এ পাশ করে গবেষণা করছে। কিন্তু দেখা হলেই বলে, বাপিদা, তুমি কিন্তু এখনও আমার চিঠির উত্তর দিলে না!
দু’জনেই হেসে উঠি।