সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ দৃশ্যটা একটু অন্য রকম ছিল।
বন্ধু বীরেশের উপরোধে গাড়িতে রাজনৈতিক সভার কাছাকাছি গিয়েও নামতে পারলেন না ‘নায়ক’ অরিন্দম! বন্ধুবিচ্ছেদের ঝুঁকি নিয়েও শেষ মুহূর্তে ওই চত্বর থেকে প্রায় পালিয়ে এলেন তিনি।
অরিন্দম অবশ্য বিরোধী দলের সভা থেকে পালিয়েছিলেন। ২০১৪-য় এ রাজ্যে শাসক দলের প্রচারে টালিগঞ্জের তারকাদের ছড়াছড়ি। নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট-প্রচারের তারকাদের তালিকায় ফিল্ম-টিভির জগতের চেনামুখের রমরমা। রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক মুখরাই বরং সংখ্যালঘু। যুবসমাজের সমর্থন টানতে এই তারকাদের উপস্থিতি মূল্যবান পুঁজি হবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতৃত্ব।
প্রসেনজিৎ থেকে শুরু করে শুভশ্রী-শ্রাবন্তী-পায়েল-রাইমা-সোহম-পরম-যিশুরা এবং সেই সঙ্গে টিভি সিরিয়ালের ‘বাহা’ (রনিতা), মৌরী (মানালি), ‘কাজু’ (লাভলি), ‘বড় ঝিলিক’ (শ্রীতমা)-রা থাকবেন তৃণমূলের প্রচারে।
অতীতে বামফ্রন্টকে সমর্থন জানিয়ে সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বদের তরফে আবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গণনাট্য সংঘের শিল্পী বা বামমনস্ক শিল্পীরা দলীয় প্রচারে নাটক বা অন্য অনুষ্ঠান করেছেন। প্রচারসভাতেও মূলত সেই শিল্পীদেরই দেখা যেত, যাঁরা দীর্ঘদিনের বামপন্থী মুখ বলে পরিচিত। যেমন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ব্যতিক্রম অবশ্য মিঠুন চক্রবর্তী। সুভাষ চক্রবর্তীর স্ত্রী রমলা চক্রবর্তীর হয়ে প্রচার করেছেন, জঙ্গিপুরে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রচারেও গিয়েছিলেন। এখন তৃণমূল সাংসদ। এ বারের তালিকায় তিনিও তারকা-প্রচারক।
ভোট উপলক্ষে ফি-বছরই অবশ্য কংগ্রেস, বিজেপি বা সমাজবাদী পার্টির মতো কয়েকটি দলের প্রচারে বলিউডের বিগত যুগের তারকাদের কাউকে কাউকে দেখা যায় এ রাজ্যে। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত শত্রুঘ্ন সিনহা, রাজ বব্বর ছাড়াও জিনত আমন, শক্তি কপূর, পুনম ধিলোঁদের মুখ সভায় বা রোড-শোয়ে বারবার দেখা গিয়েছে। কিন্তু শাসক দলের সৌজন্যে একেবারে হাল আমলের নায়ক-নায়িকাদের চর্মচক্ষে দেখার এমন ঢালাও সুযোগ অতীতে এ রাজ্যে তৈরি হয়নি।
দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মুখ্য আধিকারিক ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের মুখ্য আধিকারিকের কাছে তৃণমূলের দু’টি আলাদা তালিকা পেশ করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুকুল রায় ছাড়া মিঠুন-দেব-মুনমুনরা দু’টি তালিকাতেই আছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কেন্দ্রে লোকসভা ভোট ও বিধানসভার উপনির্বাচনে প্রচারের জন্য যে তারকাদের তালিকা, তাতে মমতা-মুকুল ছাড়া তৃণমূলের দলীয় পদাধিকারী কারও নামই নেই।
প্রশ্ন উঠছে, প্রচারে তৃণমূলের দলীয় নেতারা কি তবে খানিকটা ব্রাত্য? রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ফিল্মি তারকারা কতটা গুছিয়ে দলের বার্তা পৌঁছে দিতে পারবেন? এ ব্যাপারে তৃণমূলের অবশ্য নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। দলের নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় দাবি করছেন, যুবসমাজকে কাছে টানতে জনপ্রিয় তারকাদের উপস্থিতি কাজে আসবে। তারকারা রাজনীতির জগতের বাইরের লোক। ফলে তাঁদের মধ্যে থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব তথা সরকারের সাফল্যের কথা উঠে এলে, তা মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে। দলের নেতারাও দরকার মতো তাঁদের সাহায্য করবেন বা আগলে রাখবেন।
তারকাদের আনতে গিয়ে কি প্রচারের খরচ বেড়ে যাবে? কমিশন সূত্রের খবর, এমনিতে কোনও প্রার্থীর ভোট-প্রচারের খরচ এখন সর্বোচ্চ ৭০ লক্ষ টাকা। কোনও তারকা হেলিকপ্টার বা কনভয়ে এক বা একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে সভা করতে গেলে, সেই খরচের অর্ধেক ওই প্রার্থীদের প্রচারের খরচের বাজেট থেকে নিতে হবে। আর তারকা যদি আলাদা ভাবে গিয়ে প্রার্থীর মঞ্চে ওঠেন, প্রার্থীকে সেই ব্যয়ভার বহন করতে হবে না। আর সামগ্রিক ভাবে কোন দল প্রচারে কত টাকা খরচ করল, তার কোনও উর্ধ্বসীমা ঠিক করা নেই।
এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল সিপিএমের পেশ করা তালিকায় পলিটব্যুরোর নেতা প্রকাশ কারাট, বিমান বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে দলীয় সদস্য কয়েক জন তরুণ ছাত্রনেতা রয়েছেন। কিন্তু কোনও ফিল্ম বা টিভি-তারকা নেই। বিজেপি বা কংগ্রেসের তারকা-প্রচারকদের তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহম্মদ সেলিম তৃণমূলকে কটাক্ষ করে বলছেন, “যা দেখছি, তারকারাই সব! তৃণমূলের নিজেদের নেতাদের উপরেই ভরসা নেই।”
সভায় গিয়ে কী বলবেন ঠিক করেছেন তারকারা? টিভি ধারাবাহিকে ‘মৌরী’ বলে পরিচিত মানালি দে জানতেনই না তালিকায় তাঁর নাম আছে। খবর শুনে বলেছেন, “এখনই বলতে পারছি না, কী বলব! তবে আমি সব সময়েই ওঁর (মমতা) জন্য আছি।” তালিকার আর এক মুখ সঙ্গীত-শিল্পী অনুপম বলছেন, “বিষয়গুলি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।”